ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলা এবং এর জবাবে তেহরানের পাল্টা হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বাংলাদেশ সময় সকাল পৌনে ৯টার দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ৫১ ডলার বেড়ে ৯০ দশমিক ৬১ ডলারে উঠেছে। আগের দামের তুলনায় এটি ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ১৩ ডলার বা ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়ে ৮৫ দশমিক ৫৩ ডলারে দাঁড়ায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার পর তেহরানের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার মধ্যে এমন পরিস্থিতি তেলের বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
এর আগে রোববার হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপে ইরানের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। জুলাইয়ের শেষের পর ইরানের ভূখণ্ডে এটি ছিল ওয়াশিংটনের প্রথম হামলা।
পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। দেশটির বিপ্লবী গার্ডের বরাত দিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, কিং হুসেইন ও আজরাক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। আইজি মার্কেটের বিশ্লেষক টনি সাইকামোর জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখন নতুন করে উত্তেজনার পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই উত্তেজনা কতদিন স্থায়ী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সংঘাত বাড়লে ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৮৫ দশমিক ৮০ থেকে ৮৫ দশমিক ৯০ ডলারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ স্তর অতিক্রম করতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। এরপর দাম ৮৭ দশমিক ৬৯ ডলার এবং শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ের সর্বোচ্চ ৯৩ দশমিক ৫০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
এদিকে সংঘাত বন্ধে চলমান আলোচনা অচলাবস্থায় থাকলেও মধ্যস্থতাকারীরা হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও কমেছে। জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্তে প্রণালিটি দিয়ে দৃশ্যমান পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা দিনে মাত্র পাঁচটিতে নেমে আসে। হামলার আশঙ্কায় বিভিন্ন শিপিং কোম্পানি সতর্ক অবস্থান নেওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে ভেতরের দিকে যাওয়ার সময় একটি তেলবাহী ট্যাংকারে প্রজেক্টাইল আঘাত হানে।
অন্যদিকে, ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন প্রতি সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ‘সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করতে পারে। এর মাধ্যমে ইরানকে বৈশ্বিক ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে আগস্ট মাসের সামগ্রিক হিসাবে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের দাম সামান্য কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত সপ্তাহেই দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমেছিল।
এদিকে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রণালিটি দিয়ে তেল পরিবহন বাড়তে শুরু করায় সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন এএনজেডের বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত পুনরায় পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সম্প্রতি হওয়া একটি চুক্তির আওতায় পাওয়া তেল দিয়ে দেশটির কৌশলগত মজুত বাড়ানো হবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এই মজুত প্রায় ৪৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে।
সদ্য সংবাদ/এসকে