বিগত ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী সরকারের শাসনামলে ভোটাধিকার সংকুচিত থাকার পর বাংলাদেশ আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ সময় পর নির্বাচনকে ঘিরে ছাত্ররাজনীতিতে যেমন নতুন করে সক্রিয়তা বেড়েছে, তেমনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝেও তৈরি হয়েছে কৌতূহল ও প্রত্যাশার আবহ। এটি যেন জাতির জন্য একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্র সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ ভোটারদের কাছে এই নির্বাচন মানে জীবনের প্রথম ভোট, প্রথম প্রত্যাশা এবং প্রথম স্বপ্নের বাস্তব প্রকাশ।
এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছাত্রনেতাদের মাঝেও বইছে নতুনভাবে গড়ে ওঠার স্বপ্ন ও প্রত্যয়ের হাওয়া। এই নির্বাচন নিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা কী ধরনের প্রত্যাশা করছেন—সে বিষয়ে কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ইব্রাহিম।
কুবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সময় অতিক্রম করছে। সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের বিষয় নয়; এটি জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের বড় পরীক্ষা। দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে রয়েছে উদ্বেগ ও নানা প্রশ্ন। একজন সচেতন নাগরিক ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক হিসেবে আমি মনে করি, এই নির্বাচন হতে হবে অবাধ ও সুষ্ঠু। নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই জনগণের আস্থা ফেরাবে।”
তিনি আরও বলেন, “ভোট যেন ভয়ভীতি ও চাপমুক্তভাবে অনুষ্ঠিত হয়—এটাই আজ দেশের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা। এই নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে তরুণ সমাজ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। মতপ্রকাশ ও বাকস্বাধীনতা নিয়েও ছিল হতাশা। এখন তরুণরা আর নীরব থাকতে চায় না। তারা চায় জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, চায় ন্যায্য রাজনীতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। ছাত্রনেতা হিসেবে তরুণদের ভাবনা আমি কাছ থেকে দেখি। তাদের বার্তা স্পষ্ট—ভোটাধিকার ছাড়া গণতন্ত্র অর্থহীন। নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ দূর করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা হতে হবে দৃশ্যমান। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে থাকতে হবে পক্ষপাতমুক্ত। সহিংসতা ও দমননীতি কখনো দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে না। সব রাজনৈতিক শক্তিকে সংযম দেখাতে হবে। শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পথেই অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করাই আজ সবার দায়িত্ব।”
কুবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন আবির বলেন, “দীর্ঘ সতেরো বছর পর দেশের রাজনীতির পটপরিবর্তনের পর ভোটের আমেজ ও উৎসব শুরু হয়েছে। আজকের নির্বাচন আমাদের জন্য পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের সকল তরুণ যেন তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারে—ভোটকেন্দ্র হতে হবে অন্তঃপ্রভাবমুক্ত, যেখানে কোনো দলের প্রভাব থাকবে না এবং সবাই নির্বিঘ্নে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে পারবে। আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান তরুণরা যেদিকে রায় দেবে, রাষ্ট্রের চাবি সেদিকেই যাবে। তরুণরা এমন একটি সরকার বেছে নেবে বলে আমরা আশাবাদী, যারা জুলাই অভ্যুত্থানকে হৃদয়ে ধারণ করবে। তারুণ্যের যে বাংলাদেশ, তারুণ্যের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা, সে আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে। দীর্ঘদিন পর ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ায় সকল জনগণ ও শিক্ষার্থীসমাজ যেন নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে—এটাই আমার প্রত্যাশা।”
কুবি শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনার পতন ঘটে। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে বিএনপি ও ছাত্রদল বহু সহযোদ্ধাকে হারিয়েছে; অনেকেই গুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য ১৭ বছর অপেক্ষার পর অবশেষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সরকার প্রতিষ্ঠিত হোক। দীর্ঘদিন মানুষ ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও শান্তি থেকে বঞ্চিত ছিল। আসন্ন নির্বাচনে জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠাবে—এই বিশ্বাস আমার আছে। বাংলাদেশের মানুষ কখনো দেশবিরোধী বা স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষমতায় বসাবে না; তারা দেশপ্রেমিক ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বই নির্বাচন করবে।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনে কোনো ধরনের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বা কারসাজি রোধে তরুণ প্রজন্ম মাঠে সোচ্চার থাকবে। কেউ নির্বাচন বানচাল বা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইলে তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। আমি বিশ্বাস করি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এ দেশের মানুষ ভালোবাসে। দেশের জন্য দীর্ঘ নির্বাসন ও নির্যাতন সহ্য করা এই নেতার ত্যাগ জনগণ স্মরণ রাখবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শে গড়ে ওঠা তারেক রহমানের রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা। আগামী সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকারত্ব হ্রাস, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার, নারী ও শিশু নিরাপত্তা এবং দুর্নীতি দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে—এটাই জনগণের প্রত্যাশা। বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা ও বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে—এই বিশ্বাস নিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে চাই।”
কুবি শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জুলাইয়ের চৌদ্দশ শহীদ এবং বিশ হাজার পঙ্গুত্ববরণকারী ভাইদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে হতে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা পূরণে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলো বারবার ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এবার এমন একটি সরকার চাই, যারা জনগণের ভাষা বুঝবে এবং দেশে চলমান বৈষম্য দূর করে আঠারো কোটি মানুষের জন্য বাংলাদেশকে বাসযোগ্য করে তুলবে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠানকে সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আমরা বিগত সময়ে দেখেছি, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিজেদের দখলদারত্ব কায়েম করতে চায়। নিজেদের গড়া বাহিনী দিয়ে হল দখল করে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করে রাখার চেষ্টা করা হয়। আমরা আশা করি, আগামীতে যে সরকার আসবে তারা ক্যাম্পাসগুলোকে নিরাপদ ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশে রূপান্তর করবে।”