প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও যুক্তরাজ্যভিত্তিক উচ্চশিক্ষাবিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই)-এর বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে স্থান পায়নি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি)। একইভাবে কোয়াকোয়ারেলি সাইমন্ডস (কিউএস) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়েও এখন পর্যন্ত স্থান হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়টির।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত টাইমস হায়ার এডুকেশনের ২০২৭ সালের ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে এবং ১০টি ‘রিপোর্টার’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে এ তালিকায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই।
টিএইচইর ২০২৭ সালের ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের ১১৮টি দেশ ও অঞ্চলের ২ হাজার ২৯৭টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। শিক্ষা, গবেষণার মান, গবেষণার পরিবেশ, শিল্প খাতের সঙ্গে সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল্যায়ন করা হয়েছে।
জানা গেছে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান উন্নয়নের লক্ষ্যে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ২১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদারের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কাউছার আহম্মেদ পাটোয়ারীকে আহ্বায়ক এবং ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মঞ্জুর হোসেনকে সদস্যসচিব করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. কাউছার আহম্মেদ পাটোয়ারী বলেন, ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন ২০২৭ সালের র্যাঙ্কিং প্রকাশ করেছে। র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করতে হয়। পাশাপাশি আবেদন প্রক্রিয়াটি অনেক আগেই সম্পন্ন করতে হয়। বর্তমানে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেটি মাত্র দুই মাস আগে দায়িত্ব পেয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘২০২৮ সালের কিউএস র্যাঙ্কিংয়ের জন্য সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর এবং ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে আবেদন করতে হবে। তবে যেসব সংস্থা র্যাঙ্কিং প্রকাশ করে, তাদের ওয়েবসাইটে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পোর্টাল নিবন্ধিত থাকা প্রয়োজন। এত দিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কোনো পোর্টাল ছিল না। বর্তমানে সেই পোর্টাল নিবন্ধন করা হয়েছে।’
অধ্যাপক কাউছার আহম্মেদ আরও বলেন, ‘জনপ্রতি ৪৮টি করে তথ্য প্রায় ৪০০ জনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি আমরা কমিটির সদস্যদের নিয়ে আগামী সপ্তাহে একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করব। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, যাতে ২০২৮ সালের র্যাঙ্কিংয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আসে।’
বিশ্ববিদ্যালয়টি র্যাঙ্কিংয়ে না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার আহমদ আশরাফী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় টাইমস হায়ার এডুকেশনে স্থান না পাওয়া একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক এবং একই সঙ্গে ক্ষোভের। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা আসলে কতটুকু আন্তরিক?’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান শুধু একটি সংখ্যার বিষয় নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো এবং সামগ্রিক অগ্রগতির প্রতিফলন। আমরা কি শুধু সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছি? আমাদের কি গবেষণার স্বপ্ন দেখার অধিকার নেই? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের পরিচিত করার যোগ্যতা রাখে না?’
আবরার আহমদ আরও বলেন, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন শুধু নতুন ভবন নির্মাণ কিংবা কিছু অবকাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। গবেষণায় বরাদ্দ, গবেষণার পরিবেশ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, একাডেমিক পরিকল্পনা এবং র্যাঙ্কিংয়ে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত যথাযথভাবে উপস্থাপন—এসব বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ থাকতে হবে।’
এ বিষয়ে গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মাহবুব বলেন, ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে টাইমস হায়ার এডুকেশন বা কিউএস র্যাঙ্কিংয়ের কোনোটিতেই আগে আবেদন করা হয়নি। এবারই প্রথম র্যাঙ্কিংয়ে যুক্ত হওয়ার জন্য নিবন্ধন ও আবেদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেলের পরিচালকের নেতৃত্বে কয়েকজনকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণার ব্যাপ্তি বিবেচনা করলে অনেক আগেই এই উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এই উদ্যোগটি হাতে নিয়েছেন।’
অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মাহবুব আরও বলেন, ‘র্যাঙ্কিংয়ের জন্য একটি আলাদা র্যাঙ্কিং সেল গঠন করা উচিত, যার কাজ হবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য কাজ করা। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়ায় সব তথ্য-উপাত্ত ও প্রোফাইল হালনাগাদ করে আবেদন সম্পন্ন করা সম্ভব হলে, আশা করছি আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় একটি আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে স্থান পাবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়কে র্যাঙ্কিংয়ে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ সম্পন্ন করতে আমরা একটি কমিটি গঠন করেছি। এ বিষয়ে আগামী সপ্তাহে কমিটির সদস্যদের নিয়ে একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে, যাতে র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে সবাইকে প্রয়োজনীয় ধারণা দেওয়া যায়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আপাতত কিউএস র্যাঙ্কিংয়ের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। পরবর্তী সময়ে টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাঙ্কিংয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করব।’
সদ্য সংবাদ/ এআর