পড়াশোনার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) আসেন অসংখ্য শিক্ষার্থী। নিজ জেলা ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন শহরে এসে পড়াশোনা, আবাসন ও দৈনন্দিন জীবন সামলাতে হয় তাঁদের। তবে ক্যাম্পাসের বাইরে চলাচলের সময় বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন অনেক শিক্ষার্থী। বিশেষ করে নোয়াখালীর স্থানীয় পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে অপরিচিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা শিক্ষার্থীদের সেই নিরাপত্তা শঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। এর মধ্যে গত ২ অক্টোবর মাইজদী শহরের বার্লিংটন মোড় এলাকায় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধরের চেষ্টা ও মব সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি মোবাইল ফোন চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁদের সেখানে ডেকে নেওয়া হয়। পরে স্থানীয় কয়েকজন তাঁদের ওপর চড়াও হন।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরমান হোসাইন জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর ভোরে তাঁর বসতবাড়ি থেকে একটি মোবাইল ফোন চুরি হয়। এ ঘটনায় ওই দিনই স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি।
ঘটনার বিষয়ে একই বিভাগের শিক্ষার্থী সজিব আহমেদ বলেন, বার্লিংটন মোড় এলাকায় আরমানের মোবাইল চুরির কয়েক দিন পর একই এলাকায় একটি ল্যাপটপ চুরির ঘটনায় দুই যুবক হাতেনাতে ধরা পড়েন। বিষয়টি জানতে পেরে তাঁরা চুরি হওয়া মোবাইলের বিষয়ে খোঁজ নিতে সেখানে যান।
সজিবের ভাষ্য, “সালিশে উপস্থিত হয়ে আমরা যখন মোবাইল ফোনের বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করি, তখন এলাকাবাসী ও অভিযুক্তদের অভিভাবকেরা আমাদের সহযোগিতা না করে উল্টো আমাদের ওপর চড়াও হন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও বাড়ির মালিক ও অভিযুক্তদের মা-বাবাসহ কয়েকজন আমাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। একপর্যায়ে ধাক্কা দিয়ে আমাদের বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং কয়েকজন আমাদের গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেন।”
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফখর উদ্দিন বলেন, একই এলাকায় নোবিপ্রবির অর্থনীতি বিভাগের এক শিক্ষার্থীর মেস থেকে ল্যাপটপ চুরির ঘটনায় দুই যুবককে স্থানীয়রা আটক করেন। বিষয়টি জানতে পেরে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান এবং আগের মোবাইল চুরির বিষয়েও কথা বলতে চান।
তাঁর দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর স্থানীয় কয়েকজন পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের ওপর মব সৃষ্টির চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁর বন্ধু সালমান হোশমীর ও সজীবের গায়ে হাত তোলার ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে পুলিশ অতিরিক্ত সদস্য এনে তাঁদের নিরাপদে বের করে নিয়ে যায়।
এ বিষয়ে নোবিপ্রবির প্রক্টরিয়াল বডির সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রক্টর বলেন, শিক্ষার্থীদের যেকোনো প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁদের পাশে থাকবে। শিক্ষার্থীরা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয়।
তিনি জানান, শুরুতে স্থানীয় বাসিন্দারা মোবাইল চুরির ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের পক্ষেই ছিলেন। পরে শিক্ষার্থীরা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায় এবং স্থানীয়রা অভিযুক্তদের পুলিশের কাছে হস্তান্তরে আপত্তি জানান। পরে অভিযুক্তদের থানায় নেওয়ার পর মামলা করা হবে কি না, সে বিষয়ে প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে থানার ওসির আলোচনা হয়।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, থানা-পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান ওই সহকারী প্রক্টর।
এদিকে ক্যাম্পাসের বাইরে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের আরও কয়েকটি ঘটনা রয়েছে। গত ২৯ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসটিই বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের এক ছাত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ঠক্কর এলাকায় রিকশাচালকের মাধ্যমে অপহরণের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ওই শিক্ষার্থী রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নিজেকে রক্ষা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত ১৫ জুন নোবিপ্রবির সমাজকর্ম বিভাগের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সুমনকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে। অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি রাতে নোবিপ্রবির আইসিই বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলামকে ক্যাম্পাস থেকে শহরে আসার পথে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগ ওঠে।
এসব ঘটনার পর ক্যাম্পাসের বাইরে চলাচলের সময় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগে ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোতে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সদ্য সংবাদ/ এআর