নোয়াখালীর সোনাপুরে অপহরণকারীদের কবল থেকে পালিয়ে আসা ১৪ বছর বয়সী মাদরাসাছাত্র ইব্রাহিম খলিল ফুয়াদকে উদ্ধার করেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) এক আনসার সদস্য। সোমবার (৫ অক্টোবর) ভোরে সোনাপুর এলাকায় শিশুটিকে দেখতে পেয়ে আনসার সদস্য অভিজিৎ চৌধুরী তাকে উদ্ধার করে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন। পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ইব্রাহিম খলিল লক্ষ্মীপুরের দত্তপাড়া এলাকার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দর্জিপাড়া খান বাড়ির বাসিন্দা সুমন খান ও খালেদা আক্তারের ছেলে। সে খোদাওয়ান্দপুর মুহাম্মাদিয়া (স.) মাদরাসার শিক্ষার্থী।
ইব্রাহিমের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার (৪ অক্টোবর) দুপুরে মাদরাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় আসার পর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে তিন ব্যক্তি তাকে ‘বাবু, এদিকে আসো’ বলে ডাক দেন। পরে তাঁরা তাকে ৫০ টাকা দিয়ে বলেন, টাকা না নিলে তাঁদের মন খারাপ হবে। ছোট হওয়ায় ইব্রাহিম তাঁদের দেওয়া টাকা নেয়। এরপর তাঁরা একটি কাগজ দিয়ে সেখানে লেখা ঠিকানাটি কোথায়, তা জানতে চান। কিছুক্ষণ পর তার মাথা ঘুরতে শুরু করে। একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে সিএনজিতে করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানায় ইব্রাহিম।
তার ভাষ্য, রাত ৯টা থেকে ১০টার দিকে জ্ঞান ফেরার পর সে নিজেকে একটি কক্ষে প্লাস্টিকের চেয়ারের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পায়। ওই কক্ষে রাইফেল, চাপাতিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দেখতে পায় বলেও জানায় সে। এসব দেখে আতঙ্কিত হয়ে সেখান থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেয় ইব্রাহিম।
প্রথমবার সুযোগ পেয়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে ধরে আবারও বেঁধে রাখে অপহরণকারীরা। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় সে। এরপর অপহরণকারীরা কক্ষের চাবি কোথায় রাখে, তা লক্ষ্য করতে থাকে ইব্রাহিম।
ভোররাতে সুযোগ বুঝে তৃতীয়বারের মতো কক্ষ থেকে বের হয়ে পালিয়ে যায় সে। এ সময় পেছন থেকে অপহরণকারীরা ধাওয়া করলে একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে ইব্রাহিম। কিছুক্ষণ পর গাড়ির শব্দ শুনে রাস্তা কাছেই বলে ধারণা করে সে। পরে অপহরণকারীরা চলে গেলে দৌড়ে রাস্তার দিকে চলে আসে।
একপর্যায়ে সোনাপুর রয়েল হাসপাতালের কাছাকাছি এলাকায় নোবিপ্রবির আনসার সদস্য অভিজিৎ চৌধুরীর রিকশার সামনে গিয়ে পড়ে ইব্রাহিম। তখনও ভয়ে কাউকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সে।
আনসার সদস্য অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘আজ ভোর ৫টা ১০ মিনিটে আমি সোনাপুরে বাস থেকে নামি। এরপর রিকশায় করে ক্যাম্পাসের উদ্দেশে রওনা হই। রিকশাটি সোনাপুর রয়েল হাসপাতালের কাছাকাছি পৌঁছালে দেখি, একটি ছেলে একটি গলি থেকে আমার রিকশার সামনে এসে পড়ে। তখন কয়েকজন তাকে ধরার জন্য পেছন থেকে তাড়া করছিল।’
তিনি বলেন, ‘ছেলেটির অবস্থা দেখে আমার সন্দেহ হয়। পরে তাকে রিকশায় করে নোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে নিয়ে আসি। সেখানে তার কাছ থেকে বাবার মোবাইল নম্বর নিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করি।’
ইব্রাহিমের খালাতো বোনের স্বামী মারুফ বলেন, ‘সকালে আমার শাশুড়ি ফোন করে জানান, ইব্রাহিমকে গতকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে জানতে পারি, ইব্রাহিম একজন আনসার সদস্যের কাছে আছে। এরপর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তাকে আনতে আসি।’
অপহরণের ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে মারুফ বলেন, ‘পরিবারের সদস্যরা পুলিশের কাছে যেতে চাননি। এ কারণে এখন পর্যন্ত কোনো জিডি বা অন্য কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’
পরিবারের দাবি, ইব্রাহিমকে অপহরণ করে নোয়াখালীর সোনাপুরের একটি বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল। তবে কারা তাকে অপহরণ করেছে, কোথায় তাকে আটকে রাখা হয়েছিল এবং এর পেছনে কারা জড়িত—এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, অপহরণকারীদের কবল থেকে পালিয়ে আসা শিশুটিকে দ্রুত শনাক্ত করে নিরাপদে উদ্ধার এবং পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ায় আনসার সদস্য অভিজিৎ চৌধুরীর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন স্বজনেরা। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সদ্য সংবাদ/ এআর