রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাত নেতা-কর্মীকে শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্তদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগেও চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ উঠেছিল। তাদের মধ্যে দুজনকে একপর্যায়ে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে কমিটিতে পুনর্বহাল করা হয়।
ভিডিও ফুটেজে শনাক্ত ব্যক্তিরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবিব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম, সহসভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমন, সহ-সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম (সাজু), সহ-দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম অথই এবং অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী বিশাল চক্রবর্তী।
আইন বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর চাঁদাবাজির অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। একই ঘটনায় ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাসিবুল ইসলামকেও সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। বর্তমানে দুজনই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন।
পরবর্তীতে তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট ঘোষিত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কমিটিতে আহসান হাবিব ও হাসিবুল ইসলামকে রাখা হয়।
আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে আরও একটি চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। গত বছরের ২৪ জুন রাজশাহীর বুধপাড়া এলাকায় এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কাছে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগে পরদিন প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন ওই শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় মতিহার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়।
এ ছাড়া ছাত্রদলের সহসভাপতি তাকবীর আহমেদ ইমন ও সহ-সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম সাজুর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুই নেতার কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নগদের মাধ্যমে ১০ হাজার ১০০ টাকা নেওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে মারধর এবং পুলিশে তুলে দেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও করা হয়েছিল।
হামলার ভিডিওতে বিশাল চক্রবর্তীকে ডেইলি স্টারের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক নূর আহসান মৃদুলকে টেলিস্কোপিক ব্যাটন দিয়ে আঘাত করতে দেখা গেছে। তিনি অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ না করেই তিনি বেরিয়ে যান। ছাত্রলীগের তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহিল গালিবের সঙ্গে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্যও রয়েছে।
শনাক্ত অন্যদের মধ্যে শরিফুল ইসলাম নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি। তাকবীর আহমেদ ইমন ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও সংগঠনের সহসভাপতি। সংগীত বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম অথই রয়েছেন সহ-দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্বে। আর ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সৈয়দ সাজহারুল ইসলাম সাজু সহ-সাধারণ সম্পাদক।
হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলায় কারও নাম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্যাম্পাসের সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা। সোমবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিক এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভে তারা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এর মধ্যে ছিল ‘বাহ ভিসি চমৎকার, সন্ত্রাসীদের পাহারাদার’, ‘টোকাইরা হামলা করে, প্রশাসন কী করে’, ‘ছাত্রদল হামলা করে, প্রশাসন কী করে’, ‘আমার ভাইয়ের ওপর হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই’ এবং ‘শিক্ষা সন্ত্রাস একসাথে চলে না’।
রাত পৌনে ৮টার দিকে প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলতে সেখানে যান। তিনি জানান, উপাচার্য অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম আন্দোলনকারীদের সঙ্গে উপাচার্যের সম্মেলন কক্ষে আলোচনায় বসতে চান। তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে দেন, তাদের প্রথম দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় যাবেন না।
এরপর রাত ৮টার দিকে উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রশাসন ভবনে প্রবেশ করলে তাদের উদ্দেশে স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনকারীদের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে হামলায় জড়িতদের ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে শনাক্ত করে মামলায় নাম অন্তর্ভুক্ত এবং ওই দিনই গ্রেপ্তার করা, জড়িতদের সাময়িক বহিষ্কার, তিন দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে শুক্রবারের মধ্যে জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা। ছাত্রত্ব নেই এমন হামলাকারীদের সনদ বাতিলের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার দাবিও রয়েছে।
এ ছাড়া হামলাকারীদের পক্ষ নেওয়া এবং সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষকে অপসারণ ও তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও দায়িত্ব পালনে নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগে প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরদের পদত্যাগও দাবি করা হয়েছে।
রাবি সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি ইরফান তামিম বলেন, তাদের প্রথম দাবি ছিল ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করে মামলায় নাম যুক্ত করা এবং গ্রেপ্তার করা। প্রশাসন পরদিন দুপুরের মধ্যে মামলা করে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যায় যে মামলা করা হয়েছে, সেখানে কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
তার অভিযোগ, প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি দীর্ঘায়িত করছে। হামলাকারীদের রক্ষা করতে, নাকি কোনো ছাত্রসংগঠনকে সুবিধা দিতে এই প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
শিক্ষার্থী শাহ পরান বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের পরিষ্কারভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে। তারপরও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। হামলাকারীদের নাম মামলায় যুক্ত করে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় না বসার কথা জানান তিনি।
এর আগে সোমবার হামলার ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম-২-কে আহ্বায়ক করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মো. আরিফুল ইসলাম, ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এম আসাদুল হক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. আনিসুর রহমান এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কাজী মামুন হায়দার। সূত্র: আগামীর সময়
সদ্য সংবাদ/ এআর