ল্যাব সংকট পেরিয়ে বিশ্বসেরা ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় ড. তরিকুল ইসলাম

গ
গোবিপ্রবি প্রতিনিধি (তাসিন জায়েফ)
১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:০৪:১৭

বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় বাংলাদেশের গবেষকদের মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তরিকুল ইসলাম। ২০২৬ সালের একক বছরের গবেষণাভিত্তিক এ তালিকায় তাঁর বিশ্ব অবস্থান ৫ হাজার ৪৯৭তম। ২০২০ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এ তালিকায় স্থান পাচ্ছেন তিনি। এবারের অর্জন তাঁর কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তাঁর সঙ্গে তাঁর বিভাগের তিনজন গবেষক শিক্ষার্থীও তালিকায় স্থান পেয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ার প্রকাশিত এ তালিকায় বাংলাদেশের ৮৮টি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ৩৪৭ জন গবেষক স্থান পেয়েছেন।

গবেষণার প্রতি আগ্রহ, প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে চলা, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিবেশ এবং তরুণদের গবেষণায় যুক্ত করার উপায় নিয়ে কথা বলেছেন ড. তরিকুল ইসলাম। তাঁর মতে, গবেষণায় আর্থিক সংকট ও দুর্বল ল্যাব-সুবিধা বড় বাধা হলেও গবেষকের ইচ্ছাশক্তি, মেধা ও অধ্যবসায় আরও গুরুত্বপূর্ণ।

সহপাঠীর তিরস্কার থেকে গবেষণার পথে

গবেষক হয়ে ওঠার গল্প বলতে গিয়ে ড. তরিকুল ইসলাম জানান, ফার্মেসি পড়ার সময় বিভিন্ন তত্ত্ব ও উপাত্ত গভীরভাবে যাচাই করার আগ্রহ থেকেই তাঁর গবেষণার যাত্রা শুরু। তবে এ পথে এগিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে এক সহপাঠী ও সহকর্মীর তিরস্কারও।

তাঁর ভাষ্য, "ওই তিরস্কার তাঁকে গবেষণার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে অনুপ্রাণিত করেছিল। পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার ইচ্ছা তাঁকে গবেষণায় আগ্রহী করে তোলে। বর্তমানে তাঁর গবেষণাজীবনের অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা তাঁর শিক্ষার্থীরা।"

তবে গবেষণার শুরুটা সহজ ছিল না। স্নাতক শেষে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গবেষণার অনেক বিষয়ই তাঁর শেখা হয়নি। শিক্ষার্থীদের গবেষণা শেখানো ও প্রকল্প পরিচালনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ক্লাসের ফাঁকে, অবসরে এবং ছুটির দিনগুলোতে গবেষণার চর্চা শুরু করেন।

এ সময় আর্থিক সংকট, ল্যাব-সুবিধার অভাব এবং উপযুক্ত মেন্টরের ঘাটতির মুখোমুখি হন তিনি। পরে গবেষণাগারের সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বল্প ব্যয়ের পদ্ধতিতে কাজ শুরু করেন। ল্যাবের বাইরে তথ্যনির্ভর গবেষণা ও রিভিউ নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা-সহযোগিতা গড়ে তোলেন।

গবেষণার কেন্দ্রে ওষুধ আবিষ্কার ও মানবকল্যাণ

ড. তরিকুল ইসলামের গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র মেডিসিনাল কেমিস্ট্রি, ড্রাগ ডিসকভারি ও ড্রাগ ডেভেলপমেন্ট। উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীব থেকে পাওয়া বিভিন্ন যৌগের কার্যকারিতা এবং রোগ নিরাময়ে সম্ভাব্য ভূমিকা অনুসন্ধান করেন তিনি। পাশাপাশি প্রচলিত ওষুধের নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও তাঁর গবেষণা রয়েছে।

অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিসফাংশন, ফাইটল, মেডিসিনাল কেমিস্ট্রি এবং করোনাভাইরাস-সংক্রান্ত গবেষণাগুলো তাঁর গবেষণাগত পরিচিতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এসব কাজের বড় অংশ ব্রাজিলে তাঁর পিএইচডি ও পোস্টডক্টরাল গবেষণার সময় করা।

গবেষণার ফলাফল মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোই তাঁর মূল লক্ষ্য। এ জন্য প্রাকৃতিক উৎস থেকে সম্ভাবনাময় যৌগ শনাক্ত করার পাশাপাশি ওষুধের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা যাচাইকে গুরুত্ব দেন তিনি।

গবেষণায় নিজের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি জানান, গুগল স্কলারের তথ্য অনুযায়ী, বই, গবেষণাপত্র, সম্মেলন ও অন্যান্য প্রকাশনা মিলিয়ে তাঁর প্রকাশনার সংখ্যা ৮০০-এর বেশি। তাঁর সাইটেশন ১৬ হাজার ৬৮১, এইচ-ইনডেক্স ৫৯ এবং আই১০-ইনডেক্স ২৭৮। ২০২৪ সালে তাঁর বিশ্ব অবস্থান ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার ৮৪২তম, ২০২৫ সালে ৭ হাজার ৯৭০তম এবং ২০২৬ সালে ৫ হাজার ৪৯৭তম।

গোবিপ্রবিতে গবেষণার সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা

গোবিপ্রবিতে গবেষণা করতে গিয়ে ল্যাবরেটরি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, অভিজ্ঞ ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট এবং পর্যাপ্ত জায়গার অভাব রয়েছে বলে জানান এ গবেষক। তবে তাঁর মতে, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি গবেষণায় উৎসাহ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।

তিনি মনে করেন, "উচ্চ সিজিপিএ অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি গবেষণায় অবদান রাখা শিক্ষার্থীদেরও বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহ বাড়বে।"

নিজের গবেষণা প্রকল্পের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অনার্স প্রকল্প ও মাস্টার্স থিসিসকে গুরুত্ব দেন তিনি। এসব গবেষণার যথাযথ পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে মানসম্মত প্রকাশনা তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, "যেসব শিক্ষার্থী থিসিসের সুযোগ পেলেও গবেষণা তহবিল পান না, তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে আরও ভালো মানের গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে।"

এ ছাড়া পর্যাপ্ত গবেষক শিক্ষকের অভাব, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিকল্পনার ঘাটতি, দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণায় অনাগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক সেমিনার, সম্মেলন ও কর্মশালার অপর্যাপ্ততাকে গবেষণার অগ্রগতির বাধা হিসেবে দেখছেন তিনি।

গবেষণায় শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার তাগিদ

শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী করতে বিভাগভিত্তিক স্বল্প ব্যয়ের গবেষণা, জরিপ এবং তথ্যনির্ভর প্রকল্পে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন ড. তরিকুল ইসলাম। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের থিসিস ও প্রকল্প থেকে নিয়মিত মানসম্মত গবেষণাপত্র প্রকাশ, দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষায় থাকা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে সেমিনার আয়োজন এবং বিভিন্ন বিভাগের যৌথ গবেষণা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

তাঁর মতে, মাস্টার্সে থিসিসের সুযোগ নির্ধারণে শুধু সিজিপিএ নয়, শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও পছন্দকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। গবেষণায় অবদান রাখা শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি দেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে।

তরুণ গবেষকদের জন্য পরামর্শ

তরুণদের গবেষণা শুরু করার ক্ষেত্রে বড় প্রকল্পের পরিবর্তে ছোট ও বাস্তবায়নযোগ্য বিষয় বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, প্রথমে কম্পিউটার দক্ষতা, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার ব্যবহার এবং গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনের কৌশল শেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত গবেষণাপত্র পড়া, বৈজ্ঞানিক ইংরেজি শেখা এবং গবেষণার নৈতিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

গবেষণায় আগ্রহীদের উদ্দেশে ড. তরিকুল ইসলাম বলেন, "গবেষণা মানেই শুধু জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশ নয়; এটি নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও সত্য অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া। প্রকাশনা গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলেও মানুষের কল্যাণে জ্ঞান ও মেধার ব্যবহারই হওয়া উচিত এর মূল উদ্দেশ্য।"

তিনি আরও মনে করেন, "ব্যয়বহুল ল্যাবরেটরি না থাকলেও সাহিত্যভিত্তিক পর্যালোচনা, রিভিউ, মেটা-অ্যানালাইসিস এবং দেশ-বিদেশের গবেষকদের সঙ্গে যৌথ কাজের মাধ্যমে গবেষণা শুরু করা সম্ভব। ইংরেজিতে দুর্বলতা কিংবা কম সিজিপিএকে গবেষণার পথে চূড়ান্ত বাধা হিসেবে দেখারও প্রয়োজন নেই।"

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভবিষ্যতে নিজের গবেষণাকে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান ড. তরিকুল ইসলাম। বিশেষ করে ক্লিনিক্যাল গবেষণা, ড্রাগ ডিজাইন এবং উন্নত টক্সিকোলজিক্যাল বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দিতে চান তিনি। এ ক্ষেত্রে দেশের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও মেডিকেল কলেজগুলোর সহযোগিতা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

পাশাপাশি দেশ-বিদেশের বিদ্যমান গবেষণা-সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্রও বাড়াতে চান তিনি।

গবেষণার এই যাত্রায় তাঁর উপলব্ধি, সীমাবদ্ধতা থাকবেই; তবে সেগুলোকে অতিক্রম করতে প্রয়োজন ধৈর্য, অধ্যবসায়, কৌতূহল ও শেখার মানসিকতা। আর গবেষণাকে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের মাধ্যম হিসেবে নয়, মানুষের কল্যাণে অবদান রাখার পথ হিসেবে দেখলেই এর প্রকৃত সার্থকতা অর্জিত হবে।

সদ্য সংবাদ/এসকে

ক্যাম্পাস ব্রেকিং

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. প্রতিটি ঘর হোক দুর্যোগ মোকাবিলার কেন্দ্রবিন্দু: রাষ্ট্রপতি সদ্য. ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাইকিং ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের মাধ্যমে সচেতনতার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর সদ্য. ঢাকা-রিয়াদ রুটে ৬১ ফ্লাইট বাতিল, বিপাকে ৯ হাজার যাত্রী সদ্য. ২১ ঘণ্টা পেরোলেও কার্যালয় ছাড়তে পারেননি চুয়েটের উপাচার্য সদ্য. সৌদি আরবে প্রবাসীদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে: প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী সদ্য. অভিনেতা সমু চৌধুরীর ওপর হামলা, মাথায় পড়েছে সেলাই সদ্য. তুহিন হত্যা মামলায় জামিন পেলেন নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র আইভী সদ্য. জার্মান পর্যটকের হারানো ল্যাপটপ ফিরিয়ে দিল পুলিশ সদ্য. প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ, ৩ শতাংশ প্রণোদনা পাবেন কার্ডধারীরা: প্রতিমন্ত্রী সদ্য. স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কলঙ্কমুক্ত থাকতে চায় সরকার: মীর শাহে আলম সদ্য. প্রতিটি ঘর হোক দুর্যোগ মোকাবিলার কেন্দ্রবিন্দু: রাষ্ট্রপতি সদ্য. ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাইকিং ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের মাধ্যমে সচেতনতার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর সদ্য. ঢাকা-রিয়াদ রুটে ৬১ ফ্লাইট বাতিল, বিপাকে ৯ হাজার যাত্রী সদ্য. ২১ ঘণ্টা পেরোলেও কার্যালয় ছাড়তে পারেননি চুয়েটের উপাচার্য সদ্য. সৌদি আরবে প্রবাসীদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে: প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী সদ্য. অভিনেতা সমু চৌধুরীর ওপর হামলা, মাথায় পড়েছে সেলাই সদ্য. তুহিন হত্যা মামলায় জামিন পেলেন নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র আইভী সদ্য. জার্মান পর্যটকের হারানো ল্যাপটপ ফিরিয়ে দিল পুলিশ সদ্য. প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ, ৩ শতাংশ প্রণোদনা পাবেন কার্ডধারীরা: প্রতিমন্ত্রী সদ্য. স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কলঙ্কমুক্ত থাকতে চায় সরকার: মীর শাহে আলম