রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক। দিনভর মানুষের ছুটে চলা, যানবাহনের শব্দ আর জীবিকার তাগিদে হাজারো মানুষের ব্যস্ততা। অথচ এই নগরীর বুকেই রাত নামলে শুরু হয় এক বৃদ্ধের নিঃসঙ্গ জীবনসংগ্রাম। মাথার ওপর খোলা আকাশ, পাশে একটি হুইলচেয়ার আর জীবিকার সম্বল ভিক্ষার ঝুলি এভাবেই দিন কাটছে আব্দুস সামাদের।
রাত গভীর হলে রাজধানীর মগবাজার মোড়ের সড়কের পাশে দেখা মেলে এই বৃদ্ধের। যখন নগরীর অধিকাংশ মানুষ ঘুমে, তখন তাঁর কাটে নির্ঘুম রাত। নেই নিরাপদ আশ্রয়, নেই আরাম করে শোয়ার ব্যবস্থা। রাত পেরিয়ে কখন সকাল হবে, সেই অপেক্ষায় থাকেন তিনি। কারণ, দিনের আলো ফুটলেই আবারও বের হতে হবে জীবিকার সন্ধানে।
আব্দুস সামাদের জীবনের গল্প কেবল দারিদ্র্যের নয়, বরং অসহায়ত্ব আর একাকিত্বেরও। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই মানুষটির চলাফেরার সঙ্গী এখন হুইলচেয়ার। মানুষের কাছে হাত পেতে যা পান, তা দিয়েই কোনোভাবে চলে তাঁর জীবন। প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে নিরাপদে রাত কাটানোর নিশ্চয়তা যেন তাঁর কাছে বিলাসিতা।
সদ্য সংবাদকে আব্দুস সামাদ জানান, তাঁর সন্তান রয়েছে। তাঁরা বড় হয়েছেন, সংসারও গড়েছেন। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আব্দুস সামাদের দিন কাটছে রাস্তায়। সন্তানদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সঙ্গ ও আশ্রয় না পাওয়ার বেদনা তাঁর জীবনের কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে।
যে বয়সে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিশ্চিন্তে সময় কাটানোর কথা, সে বয়সে তাঁকে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। একসময় হয়তো তাঁরও স্বপ্ন ছিল, বার্ধক্যে সন্তানদের পাশে পাবেন, পরিবারের সঙ্গে কাটবে জীবনের শেষ দিনগুলো। কিন্তু আজ বাস্তবতার কঠিন চিত্র মগবাজারের সড়কের পাশে হুইলচেয়ারে বসে জীবিকার অপেক্ষা।
রাজধানীর এই ব্যস্ত এলাকায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চলাচল করেন। কেউ কাজে যান, কেউ ফেরেন ঘরে, কেউবা ছুটে চলেন প্রিয়জনের কাছে। সেই মানুষের ভিড়ের মাঝেও আব্দুস সামাদের জীবন যেন থমকে আছে। তাঁর পাশে দিয়ে প্রতিদিন কত মানুষ চলে যান, কিন্তু রাত হলে মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ জায়গা তাঁর জন্য কতটা অনিশ্চিত, তা হয়তো অনেকেরই অজানা।
আব্দুস সামাদের জীবনের এই বাস্তবতা আমাদের সামনে বার্ধক্যে অসহায় মানুষের নিরাপত্তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তুলে ধরে। একজন প্রবীণ মানুষ যেন অন্তত খাবার, চিকিৎসা এবং নিরাপদ আশ্রয় পান এ নিশ্চয়তা দেওয়া পরিবার, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতো অসহায় প্রবীণদের পাশে দাঁড়াতে পারে স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং মানবিক সহায়তায় এগিয়ে আসা মানুষজন। আব্দুস সামাদের প্রয়োজন শুধু সাময়িক সাহায্য নয়; প্রয়োজন এমন একটি নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে তিনি রাতের অন্ধকারে রাস্তায় পড়ে থাকার ভয় ছাড়াই বিশ্রাম নিতে পারবেন।
মগবাজারের সড়কে হুইলচেয়ারে বসে থাকা আব্দুস সামাদ যেন নীরবে একটি প্রশ্ন রেখে যান জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে আসার পরও একজন মানুষকে কেন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে?
হয়তো কারও সামান্য সহযোগিতা, একটু সহমর্মিতা কিংবা একটি নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা বদলে দিতে পারে তাঁর জীবনের বাকি দিনগুলো। ব্যস্ত নগরীর এই অসহায় বৃদ্ধের পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়।
সদ্য সংবাদ/এসএস