পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সরকারের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে এখন হ-য-ব-র-ল অবস্থা। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে সরকারের বহুমাত্রিক অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদানের পরও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে শিশু শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা অফিসের জনবল সংকটে বিদ্যালয়গুলোতে তদারকির অভাব, শিক্ষক সংকট, শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য, সরকারি বরাদ্দ লোপাট, অকার্যকর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি নেপথ্যের কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে বিবেচ্য হলেও বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের—এমন অভিযোগ অভিভাবকসহ স্থানীয়দের।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌরশহরের ১৫১ নম্বর বাদুরতলী (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চত্বরে গিয়ে দেখা গেল, ফ্ল্যাগস্ট্যান্ডে উড়ছে বিবর্ণ জাতীয় পতাকা। বিদ্যালয় ভবনটিতে যেন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি দীর্ঘ এক যুগেও। সরকারি কোনো অনুদান কিংবা উন্নয়ন বরাদ্দ এখানে এসে যেন পৌঁছায়নি। ক্লাস চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা করছে। প্রধান শিক্ষকের কক্ষ ফাঁকা। তাঁর দেখা মিলল না বিদ্যালয়ে। শিক্ষক মিলনায়তনে দেখা মিলল জাকির নামের একজন সহকারী শিক্ষকের। আর তিনজন নারী সহকারী শিক্ষিকাকে দেখা গেল প্রথম শিফটের অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে দেখা গেছে অমনোযোগী।
বিদ্যালয়টির প্রাক্-প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষে শিশুদের কোনো শিক্ষা উপকরণ দেখা যায়নি। খেলাধুলা করার কোনো সামগ্রী নেই। দেয়ালে ABCD লেখা থাকলেও বাংলা বর্ণমালার অঙ্কন নেই। হাজিরা খাতায় ২১ জন শিক্ষার্থীর তথ্য থাকলেও বাস্তবে শ্রেণিকক্ষের মেঝেতে বসে থাকতে দেখা গেল ১০-১২ জনকে। ক্লাস নিচ্ছেন সহকারী শিক্ষিকা মাকসুদা পারভিন। প্রাক্-প্রাথমিকের পাঠদানে তাঁর কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই। অথচ তিনিই প্রতিদিন শিশু শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিচ্ছেন।
শ্রেণিকক্ষের পাশের শৌচাগারটি দেখা যায় তালাবদ্ধ। বিশুদ্ধ পানির জন্য স্থাপিত নলকূপটি প্রায় দেড় বছর ধরে বিকল। বিদ্যালয় চত্বরে নির্মিত ওয়াশ ব্লকের ট্যাঙ্কে মাসে দু-একবার পানি উত্তোলন করা হলেও সেটি সর্বদা অপরিচ্ছন্ন থাকে। শিক্ষার্থীরা গরমে হাঁসফাঁস করলেও বিশুদ্ধ পানি পানের সুযোগ নেই কোথাও। অনেক সময় বিদ্যালয়সংলগ্ন প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে গালমন্দ শুনে পানি সংগ্রহ করছে শিশুরা।
বিশুদ্ধ পানির জন্য শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের আকুতিও যেন স্পর্শ করছে না দুই যুগ ধরে একই বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা প্রধান শিক্ষিকা সুমাইয়া নাসরিনকে। তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার যেন কেউ নেই।
এ নিয়ে মুঠোফোনে কথা বললে প্রধান শিক্ষিকা জানান, ‘নজরুল বর্ষের’ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়ে অংশগ্রহণের জন্য তিনি উপজেলা পরিষদে আছেন। বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ-সম্পর্কিত তথ্য জানতে চাইলে শিক্ষা অফিস থেকে যখন যা দেওয়া হয়, তা পাওয়ার কথা বলেন তিনি। বিস্তারিত তথ্য শিক্ষা অফিসার ম্যাডামের কাছ থেকে নিতে বলেন তিনি।
প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, উপজেলার ১৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১০৮টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ৪২টি। খোদ শিক্ষা অফিসে শূন্য রয়েছে পাঁচটি পদ।
সূত্রটি আরও জানায়, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া দেশের বাইরে যাওয়ায় রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আরিফুর রহমান, চরচান্দুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা নাহিদ আক্তার সুমি ও মাঝেরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মিমি রাখাইনকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। কর্মস্থলে অনুমোদনহীন অনুপস্থিতির কারণে ইটবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহমুদ আলম পলাশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এ ছাড়া ফৌজদারি মামলার অভিযোগে লতাচাপলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. জাকির হোসেন, তাহেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এমা ওয়েন, আবুল হোসেন ও সুলতানগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আতিকুর রহমান খলিলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সাহিদা বেগম গণমাধ্যমকে বলেন, অফিসের জনবল সংকট এবং বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের জন্য সহকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হয়েছে, যা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সাহিদা বেগম আরও বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে তিনি কাজ করছেন।
সদ্য সংবাদ/ এআর