পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার গঠিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটি’ ও ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি’ নিয়ে ৫২ জনের একটি মহলের দেওয়া বিবৃতিকে ‘বিভ্রান্তিকর ও অসত্য’ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে সচেতন নাগরিক সমাজ।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে ১০২ জন নাগরিক ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা এ প্রতিবাদ জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা নিরসন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব জনগোষ্ঠীর টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যেই সরকার সম্প্রতি উচ্চপর্যায়ের এসব কমিটি গঠন করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে বর্তমান সরকার গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, বিগত দশকগুলোতে পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন, মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও স্থায়ী শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা ছিল, তা দূর করতেই এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিনিধিত্ব সংকুচিত করার কোনো উদ্দেশ্য সরকারের নেই। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পাহাড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অস্থিতিশীলতা রোধ এবং পাহাড়ি-বাঙালি সব জনগোষ্ঠীর জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বিবৃতিদাতাদের দাবি, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি আসন থেকে পাওয়া জনমতের ভিত্তিতেই সরকার প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বর জারি করা তিনটি প্রজ্ঞাপনের মূল উদ্দেশ্য পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, গুম-খুন, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধ এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় কমিটি এবং অভিজ্ঞ কাঠামোর সহায়তা নেওয়াকে একটি সুসংহত প্রশাসনিক কৌশল হিসেবে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, এ উদ্যোগকে ‘সামরিকায়ন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পরামর্শক ও নির্বাহী কমিটি আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামোগত অগ্রগতি, নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার নিয়ে সুপারিশ দেবে। তাদের মতে, এটি একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা ও আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপত্তাকে শুধু ‘নিরাপত্তার চশমা’ দিয়ে দেখলে হবে না; বরং প্রত্যেক মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয় হিসেবে দেখতে হবে।
বিবৃতিদাতারা আরও বলেন, কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এসব কমিটিকে ‘আমলাতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। তাদের দাবি, এ ধরনের বক্তব্য পাহাড়ে নৈরাজ্য ও স্থবিরতা জিইয়ে রাখার পুরোনো কৌশলকে উৎসাহিত করতে পারে এবং স্থায়ী শান্তির পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনরায় অস্থিতিশীলতা তৈরি না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারা আশা প্রকাশ করেন, নতুন কমিটিগুলোর মাধ্যমে স্বচ্ছতা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সব জনগোষ্ঠীর মতামত বিবেচনার পথ আরও সুগম হবে।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন দারুসসালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আসিফ মিজান, সাবেক সংসদ সদস্য ও ভাসানী পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. গোলাম রহমান ভূঁইয়া, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট শওকত আলী হাওলাদার, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার ফরিদুল আকবর, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. আবু তৈয়ব চৌধুরী ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনুছ, সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুল বাসেত, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট পারভেজ তালুকদার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানবাধিকার ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
এ ছাড়া বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলার সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবী, গবেষক, সমাজকর্মী, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তালিকায় সর্বশেষ স্বাক্ষরকারী হিসেবে রয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী মো. মজিবর রহমান। মোট ১০২ জন নাগরিক ও প্রতিনিধির স্বাক্ষর রয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
সদ্য সংবাদ/ এআর