‘আমার বাবা ভালো বাবা। তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে।’ বাবার কথা বলতে গেলেই কান্নায় ভেঙে পড়ে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তুবা বিনতে অরণি। বাবার সঙ্গে যেন আর কোনো অন্যায় না হয় এবং তিনি সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরে আসেন এই প্রত্যাশায় সোমবার দুপুরে বাবাকে তিন মাসের জন্য বিদায় জানিয়েছে ছোট্ট তুবা।
গত শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত তুবার বাবা অনিক সরদারকে চুরির অপবাদ দিয়ে বেঁধে রেখে মারধর করার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। আহত অনিককে বেঁধে রেখে চা ও রুটি খাওয়ানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
ঘটনার পর তুবা ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ায় স্থানীয় প্রশাসন। একই সঙ্গে পরিবারটির সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
বাবাকে নির্যাতনের খবর পেয়ে ভোররাতে ঘটনাস্থলে যাওয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে তুবা জানায়, এক ব্যক্তি তাদের বাড়িতে এসে তার বাবাকে আটকে রেখে মারধর করার খবর দেন। খবর পেয়ে সে মা ও ছোট বোনের সঙ্গে সেখানে ছুটে যায়।
তুবার ভাষায়, সেখানে গিয়ে সে দেখে বাবাকে বেঁধে রাখা হয়েছে এবং কয়েকজন তাকে লাঠি দিয়ে মারধর ও লাথি দিচ্ছে। তখন সে তাদের কাছে বাবাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করে। বাবার ক্ষুধা পেয়েছে বুঝতে পেরে পরে চা ও রুটি এনে দিলে সে নিজ হাতে বাবাকে খাওয়ায়।
তুবা জানায়, ভোর সাড়ে ৪টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সে ও তার মা অনিককে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে থাকেন। কিন্তু ওই এলাকার কয়েকজন তাদের বিভিন্নভাবে ঘোরাতে থাকেন। ক্ষুধার্ত থাকা সত্ত্বেও বাবার কাছ থেকে সে সরে যায়নি। মা ও ছোট বোনও ঘটনাস্থলের কাছেই ছিলেন।
বাবাকে শেষ পর্যন্ত বাড়িতে ফিরিয়ে আনার পর তুবা আনন্দ প্রকাশ করে বলে, এখন বাবাকে কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া হলে পরিবারের সবাই ভালোভাবে থাকতে পারবে। তার আশা, বাবা সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন এবং পরিবারের জন্য কাজ করার সুযোগ পাবেন।
তুবা আরও জানায়, ঘটনার পর যারা তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়েছিল, তারা সেদিনই তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল। পরদিনও কয়েকজন তাদের গ্রাম ছাড়ার কথা বলে বাড়িতে আসে। তবে অনিক অসুস্থ থাকায় তারা চলে যায়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেখানে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। সোমবার আর কেউ তাদের বাড়ি ছাড়ার কথা বলেনি।
তুবার মা জান্নাত বলেন, খবর পাওয়ার পর তাঁরা সবাই ঘটনাস্থলে ছুটে যান। বাবাকে মারধর করা হচ্ছে দেখে তুবা স্যান্ডেল পরারও সময় না নিয়ে দৌড়ে সেখানে যায়। মেয়েটি বাবাকে না মারার জন্য চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। তবে প্রথম দিকে কেউ তার কথা শোনেনি। বরং অনেকে ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে চুরির অভিযোগে মারধরের শিকার অনিক সরদারের দাবি, পূর্বশত্রুতা ও জমি নিয়ে বিরোধের কারণে পরিকল্পিতভাবে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে চুরির কোনো মালামাল উদ্ধার হয়নি এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণও দেখানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, যারা এ ঘটনার পরিকল্পনা করেছে, তারা দীর্ঘদিন ধরেই চাচ্ছে তিনি যেন পৈতৃক ভিটায় বসবাস করতে না পারেন।
মেয়ের সামনে বেঁধে মারধরের ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কথাও জানান অনিক। তিনি বলেন, তাঁর মতো পরিস্থিতিতে কোনো মেয়েই বাবাকে দেখতে চাইবে না। মেয়ের সামনে এমন অবস্থায় থাকায় তাঁর মরে যেতে ইচ্ছা হয়েছিল। এখন সবার সহযোগিতায় সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান তিনি।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা জানান, ঘটনা জানার পর রোববার তিনি তুবার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছে। অনিক শারীরিকভাবে অনেকটা অসুস্থ থাকায় চিকিৎসার জন্য সোমবার দুপুরে তাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
ইউএনও বলেন, আশা করা হচ্ছে তিন মাসের মধ্যে অনিক সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন। এ সময় পর্যন্ত তাঁর পরিবারের ভরণপোষণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তায় উপজেলা প্রশাসন ও সুশীল সমাজ পাশে থাকবে।
অনিককে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর সময় উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি এসএম আলাউদ্দিন নগদ অর্থ দিয়ে পরিবারটিকে সহায়তা করেছেন বলেও জানান ইউএনও মো. আলী সুজা।
তিনি বলেন, অনিকের ঘটনাটি মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তবে সবকিছুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষের নজরে এসেছে মেয়ের সঙ্গে বাবার ভালোবাসার সম্পর্কটি। সূত্র: বাংলানিউজ২৪
সদ্য সংবাদ/ এআর