সাভারের আশুলিয়ায় ধামসোনা ইউনিয়ন বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও জনমনে অশান্তি সৃষ্টির অভিযোগে ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি জাকির হোসেন মুন্সিকে দলের সব পদ-পদবি ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোখলেছুর রহমান ইলিয়াস শাহী। তবে জাকির হোসেনের দাবি, ইলিয়াস শাহী নিজেই বহিষ্কৃত হওয়ায় তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার কোনো সাংগঠনিক এখতিয়ার তাঁর নেই।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে আশুলিয়ার ফকিরবাড়িতে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তাঁর অব্যাহতির সিদ্ধান্তের কথা জানান ইলিয়াস শাহী।
ইলিয়াস শাহী ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. আসাদুল্লাহ আহমেদ দুলালের স্বাক্ষরিত দলীয় প্যাডে দেওয়া অব্যাহতিপত্রে বলা হয়, বিএনপির নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পাইকারি বাজার, আড়ত, পরিবহন ও ফুটপাতে চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে জাকির হোসেনকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তবে এরপরও তিনি এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত হননি বলে অভিযোগ করা হয়।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে দলীয় আদর্শ, শৃঙ্খলা ও নীতিবোধ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে দলের ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে তাঁকে ধামসোনা ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতির পদসহ দলের প্রাথমিক সদস্যপদ এবং সব পদ-পদবি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ইলিয়াস শাহী দাবি করেন, শ্রীপুরের দারুল এহসান মাদ্রাসায় মারধরের একটি ঘটনায় জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে আগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর সুপারিশে জাকির হোসেনকে সুযোগ দেওয়া হলেও তিনি নিজেকে সংশোধন করেননি বলে দাবি করেন ইলিয়াস শাহী।
তিনি আরও দাবি করেন, ৫ আগস্টের পর একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া ছবেরআলী মার্কেট নিয়েও জাকির হোসেনের লোকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ তোলেন তিনি।
তবে ইলিয়াস শাহীর এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জাকির হোসেন মুন্সি। তাঁর দাবি, ইলিয়াস শাহী নিজেই বহিষ্কৃত। তাই তাঁকে বহিষ্কার বা অব্যাহতি দেওয়ার সাংগঠনিক এখতিয়ার ইলিয়াস শাহীর নেই। জাকির হোসেন বলেন, ইলিয়াস শাহীর বহিষ্কারাদেশ এখনো প্রত্যাহার হয়নি। বরং তাঁর বহিষ্কারের পর থেকেই তিনি ইউনিয়ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুর বলেন, জাকির হোসেনকে অব্যাহতি দেওয়ার এখতিয়ার ইলিয়াস শাহীর নেই। কারণ, তিনি নিজেই বহিষ্কৃত।
তবে নিজের বহিষ্কারের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন ইলিয়াস শাহী। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ থানা কমিটির দপ্তর সম্পাদকের স্বাক্ষরে কেউ বহিষ্কৃত হন কি না। নিজেকে বিএনপির ত্যাগী নেতা দাবি করে তিনি বলেন, দলের জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে জুলুম, হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন এবং নিজের শত শত কোটি টাকা দলের জন্য ব্যয় করেছেন। তাঁর দাবি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগে দলের দুর্নাম হবে- এটি তিনি কোনোভাবেই মেনে নেবেন না।
ধামসোনা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. আসাদুল্লাহ আহমেদ দুলাল বলেন, জাকির হোসেনকে আপাতত অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি সংশোধিত হলে পরবর্তীতে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
ধামসোনা ইউনিয়ন বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে দুই পক্ষের এই বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের মার্চে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ইলিয়াস শাহীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাঁকে ধামসোনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কার ও দলীয় কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। এরপর আগস্টে ইউনিয়ন বিএনপির নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে ইলিয়াস শাহী ও জাকির হোসেনের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে।
জাকির হোসেনের পক্ষের দাবি, ইলিয়াস শাহী বহিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি ইউনিয়ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে ইলিয়াস শাহী তাঁর বহিষ্কারের বিষয়টি অস্বীকার করে নিজেকে ধামসোনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হিসেবে দাবি করছেন।
ফলে ইউনিয়ন বিএনপির নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান তৈরি হয়েছে। এক পক্ষের দাবি, বর্তমান নেতৃত্বের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংগঠনিক এখতিয়ার নেই। অন্য পক্ষের বক্তব্য, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দুই নেতার এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থানে ধামসোনা ইউনিয়ন বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও বিভক্তি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। বিরোধের জেরে ভবিষ্যতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বা সংঘাতের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সদ্য সংবাদ/এসকে