অনলাইন বেটিং ও জুয়ার মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ মোবাইল আর্থিক সেবা ও ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের পর ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাচারের অভিযোগে পাবনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) জেলার বিভিন্ন এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন-পাবনা সদর উপজেলার মো. মনোয়ার হোসেন, রামচন্দ্রপুর এলাকার মো. মারুফ হোসেন হলি এবং সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রামের মো. ইলিয়াস হোসেন রাজু। অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে কয়েকটি মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়েছে।
সিআইডি সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আতাইকুলা থানার বনগ্রাম বাজার এলাকা থেকে ইলিয়াস হোসেন রাজুকে আটক করা হয়। একই রাতে সাঁথিয়া থানার কাশিনাথপুর বাজার এলাকা থেকে মনোয়ার হোসেন ও মারুফ হোসেন হলিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে থাকা একটি চক্রের অনলাইন বেটিং কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তে দেখা যায়, চক্রটি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে ওয়েবসাইট তৈরি করে জুয়া ও বেটিংয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। এসব প্ল্যাটফর্মের প্রচারণা চালানো হতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনকে কেন্দ্র করে অর্থের বিনিময়ে বেটিংয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো। খেলায় অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের নির্দিষ্ট মাধ্যমে অর্থ জমা দিতে হতো। এরপর ওই অর্থের বিপরীতে বেটিং অ্যাকাউন্টে ভার্চুয়াল অর্থ যোগ করা হতো।
সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গেছে, অর্থ জমা ও উত্তোলনের জন্য চক্রটি নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব পরিবর্তন করত। এ কাজে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করে তাদের কাছ থেকে একাধিক নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করা হতো।
পরে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এসব হিসাব ও নম্বরের তথ্য বেটিং প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারীদের কাছে পাঠানো হতো। পরবর্তী সময়ে সেগুলো ব্যবহার করে জুয়ার অর্থ লেনদেন করা হয়েছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
সিআইডি বলছে, বিভিন্ন জায়গা থেকে ইলেকট্রনিক লেনদেনের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ প্রথমে এজেন্টদের মাধ্যমে একত্র করা হতো। এজেন্টরা নির্ধারিত কমিশন রেখে অবশিষ্ট অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করতেন। এরপর সেই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরের মাধ্যমে দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় গত ১৯ মে পল্টন থানায় মামলা করে সিআইডি। মামলায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২), ২১(২), ২৪(২) ও ২৭(২) ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার ছুফি উল্লাহ বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অনলাইন বেটিং কার্যক্রম এবং এ সংক্রান্ত অর্থ সংগ্রহের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। তবে চক্রটি মোট কত টাকা লেনদেন করেছে, অর্থপাচারের পুরো নেটওয়ার্কে কারা জড়িত এবং বিদেশে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়ায় আর কারা সহযোগিতা করেছে এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা আরও জানান, চক্রটির দেশি-বিদেশি সদস্যদের শনাক্ত করার পাশাপাশি অবৈধ লেনদেন ও অর্থপাচারের পরিমাণ এবং পদ্ধতি বের করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সিআইডি জানিয়েছে, অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেন, অর্থপাচার এবং এর সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চলবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে অনলাইন বেটিং ও জুয়া থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে অর্থ লেনদেন না করার পাশাপাশি কোনো তথ্য জানা থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করেছে সংস্থাটি।
এর আগে অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট ২০২৫ সালের ২৮ মে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছিল।
সদ্য সংবাদ/এসএস