মসজিদের ইমাম হিসেবে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করেছিলেন জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার মালঞ্চ জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব মুহা. মিজানুর রহমান। সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে স্বর্ণের নেকলেস দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এবং বিভিন্ন অজুহাতে কয়েকজনের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা ধার নিয়ে আত্মগোপনে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে মেলান্দহ থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগে ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা আত্মসাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মসজিদে নিয়োগের সময় জমা দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, মুহা. মিজানুর রহমানের বাবার নাম মুহা. ইসমাঈল মজুমদার এবং মায়ের নাম মোছা. হাসিনা মাহমুদা নার্গিস। তাঁর বর্তমান ঠিকানা ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানার ৩১২ দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী, ডাকঘর ফরিদাবাদ-১২০৪ এবং স্থায়ী ঠিকানা কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার উত্তর গাজিপুর আসরা মসজিদ বাড়ী উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, প্রায় তিন মাস আগে মালঞ্চ জামে মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে যোগ দেন মিজানুর রহমান। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসীর আস্থা অর্জন করেন। পরে সেই আস্থাকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত আর্থিক সংকট, বেতন না পাওয়া ও জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে কয়েকজনের কাছ থেকে টাকা ধার নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
থানায় অভিযোগকারী মো. জুবায়ের জানান, তিনি ওই মসজিদের মক্তব শিক্ষক। গত ৫ অক্টোবর মিজানুর রহমান তাঁর কাছে অর্থের প্রয়োজনের কথা বলেন। একপর্যায়ে মোবাইল ফোনে হংকং থেকে আসা একটি স্বর্ণের নেকলেসের ছবি দেখিয়ে কয়েক দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধের আশ্বাস দেন। মসজিদের ইমাম হওয়ায় তাঁকে বিশ্বাস করে জুবায়ের নগদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন।
একই ধরনের আশ্বাসে পরদিন স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. ইমরানের কাছ থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া জাহাঙ্গীর মাস্টারের কাছ থেকে ৪০ হাজার, আব্দুল্লাহর কাছ থেকে ২ লাখ, কাদেরের কাছ থেকে ৩০ হাজার এবং ইসমাঈল হোসেন রাজার কাছ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে টাকার পরিমাণ ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
স্থানীয়রা জানান, বুধবার দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। ওই দিনও অভিযুক্ত ইমাম মুসল্লিদের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন এবং স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করেন। এরপর থেকে তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তিনি আত্মগোপনে গেছেন বলে স্থানীয়দের ধারণা। তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
টাকা হারিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন অভিযোগকারী জুবায়ের। তিনি বিকাশ, নগদ ও ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা করেন। ব্যবসার মূলধনের বড় একটি অংশ তিনি ইমামের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বলে জানান।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জুবায়ের বলেন, “একজন মসজিদের ইমাম মানুষের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসের জায়গা। তিনি যদি এমন করেন, তাহলে আমরা কার ওপর বিশ্বাস করব? আমি গরিব মানুষ। অনেক কষ্ট করে ব্যবসার টাকা জমিয়েছিলাম। এখন সেই টাকা না পেয়ে খুব সমস্যার মধ্যে আছি। আপনারা আমার টাকাটা উদ্ধারের ব্যবস্থা করেন।”
এলাকাবাসী বলছেন, ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে ভুক্তভোগীরা অভিযুক্তকে সহজেই বিশ্বাস করেছিলেন। ফলে কেউ তাঁর কথায় সন্দেহ করেননি। হঠাৎ তাঁর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় এলাকায় আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে মুহা. মিজানুর রহমানের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মালঞ্চ জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুর রহিম বর্তমানে দেশের বাইরে থাকায় তাঁর বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
তবে মুঠোফোনে কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, “অভিযোগের বিষয়টি আমরা আগে জানতাম না। কেউ অর্থ লেনদেনের আগে মসজিদ পরিচালনা কমিটিকে অবহিত করেননি। বিষয়টি নিয়ে আমরা দ্রুত কমিটির সভা আহ্বান করব এবং আইনগতভাবে করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। প্রায় তিন মাস আগে তিনি এই মসজিদে নিয়োগ পেয়েছেন। এত স্বল্প সময়ে তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় সবাইকে সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।”
থানায় অভিযোগের বিষয়ে মেলান্দহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এটিএম মাহমুদুল হক বলেন, “এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি পলাতক রয়েছেন। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
সদ্য সংবাদ/ এআর