নিজস্ব উদ্যোগে আর কত দিন রক্ষা করা যাবে কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতি? লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনায় কবির বাস্তুভিটায় পড়ে থাকা দুর্লভ সামগ্রীগুলোর দিকে তাকালেই সামনে আসে এমন প্রশ্ন। একদিকে প্রায় দুই দশক ধরে বন্ধ স্মৃতি গণপাঠাগার, অন্যদিকে সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে কবির ব্যবহৃত আসবাব ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হলেও এসব ঐতিহ্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে।
কাকিনায় কবির বাড়িতে সংরক্ষিত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে কাঠের খাট, আরামচেয়ার, টুপি, দোয়াত-কলম, ক্ষুদ্রাকৃতির পবিত্র কোরআন শরিফ, ম্যাগনিফায়িং গ্লাস ও বোতামসহ বিভিন্ন স্মৃতিবিজড়িত বস্তু। কিন্তু এসব নিদর্শন রাখার ঘরটি জরাজীর্ণ। নেই উপযুক্ত সংরক্ষণব্যবস্থা। ফলে ধুলোবালি ও আর্দ্রতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উপকরণগুলো হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কবির পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী স্মৃতিচিহ্নগুলো আগলে রেখেছেন। তবে পর্যাপ্ত অর্থ, জনবল ও কারিগরি সহায়তা না থাকায় দীর্ঘমেয়াদে এগুলো সংরক্ষণ করা তাঁদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় কবির বাস্তুভিটায় সরকারি উদ্যোগে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন তাঁর উত্তরসূরি ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুধু কবির ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্নই নয়, তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারটির অবস্থাও হতাশাজনক। কাকিনা বাজারে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের পাশে ২০০৫ সালে নির্মিত ‘কবি শেখ ফজলল করিম স্মৃতি গণপাঠাগার’ দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। পাঠাগারের প্রবেশপথের সামনে দোকানপাট গড়ে উঠেছে। আশপাশে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনাও প্রতিষ্ঠানটির অবহেলিত অবস্থার চিত্র তুলে ধরছে।
স্থানীয় শিক্ষার্থী সিয়ামের মতে, একজন গুণী কবির স্মৃতি এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকা দুঃখজনক। পাঠাগারটি চালুর পাশাপাশি তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী সংরক্ষণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
কবির নাতির ছেলে শেখ ফিরোজ জানান, কবির স্মৃতিচিহ্ন দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক সাহিত্যপ্রেমী কাকিনায় আসেন। কিন্তু পরিবারের সীমিত সামর্থ্যের কারণে এসব নিদর্শন যথাযথভাবে রক্ষা করা যাচ্ছে না। তিনি সরকারি ব্যবস্থাপনায় জাদুঘর নির্মাণের পাশাপাশি কবির বিখ্যাত ‘কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক’ কবিতাটি আবারও পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
রংপুর থেকে স্মৃতিচিহ্ন দেখতে আসা দর্শনার্থী সাফি ইসলামও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কিংবা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর উদ্যোগ নিলে কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। স্থানীয় শিক্ষক অনিল কুমারেরও দাবি, পাঠাগারটি চালু করে সেখানে আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক।
১৮৮২ সালের ১৪ এপ্রিল তৎকালীন রংপুর জেলার কাকিনায় জন্মগ্রহণ করেন কবি শেখ ফজলল করিম। তাঁর বাবা আমীর উল্লাহ সরদার ও মা কোকিলা বিবি। কাকিনা মিডল ইংলিশ স্কুল ও রংপুর জেলা স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হলেও তা বেশি দূর এগোয়নি। অল্প বয়স থেকেই সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি।
নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে কাকিনায় ‘সাহাবিয়া প্রিন্টিং ওয়ার্কস’ নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন কবি। সেখান থেকে ১৯০৮ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয় মাসিক পত্রিকা ‘বাসনা’। একই ছাপাখানা থেকে ‘জমজম’, ‘কল্লোলিনী’ ও ‘রত্নপ্রদীপ’ও প্রকাশিত হতো।
গদ্য ও পদ্য মিলিয়ে তাঁর প্রায় ৪৫টি গ্রন্থ রয়েছে। ‘তৃষ্ণা’, ‘পরিত্রাণ কাব্য’, ‘ভগ্নবীণা’, ‘লাইলী-মজনু’, ‘পথ ও পাথেয়’ এবং ‘আফগানিস্তানের ইতিহাস’ তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘নীতিভূষণ’, ‘সাহিত্য বিশারদ’ ও ‘কাব্যভূষণ’ উপাধি লাভ করেন। ১৯৩৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর কাকিনাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পাঠাগারটি পুনরায় চালুর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কবির দুর্লভ স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের এই আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। তাঁদের মতে, কবি শেখ ফজলল করিমের স্মৃতিচিহ্ন রক্ষা এবং পাঠাগারটি সচল করা শুধু একটি পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি স্থানীয় ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য সংরক্ষণেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।