লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসাইনের বিরুদ্ধে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৭০ লাখ টাকা আদায় ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তাঁর বিচার দাবি করেছেন সাবেক শিবির নেতা আব্দুর রহমান বিপ্লব। অভিযোগের বিষয়ে মামলা করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে লক্ষ্মীপুর প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন বিপ্লব। তাঁর দাবি, নির্যাতনের পর তাঁকে আটটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এর মধ্যে দুটি মামলায় ২০ দিনের রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ। তবে আদালত রিমান্ড আবেদন নাকচ করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, ২০১৬ সালে রায়পুর থানার ওসির দায়িত্বে থাকার সময় লোকমান হোসাইন রায়পুর পৌর জামায়াতের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিনের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা এবং রায়পুর পৌর শিবিরের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ইমরান হোসেন পরানের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা আদায় করেন। ভুক্তভোগী এই দুই আইনজীবীর অভিযোগ, তাঁদের মারধর করে টাকা নেওয়ার পর মামলায় জড়িয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনে নিজের ওপর নির্যাতনের বিবরণ দিয়ে বিপ্লব বলেন, ২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে তৎকালীন ওসি লোকমান হোসাইনের নির্দেশে পুলিশ তাঁর বাসায় অভিযান চালায়। এ সময় দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। পরে তাঁর চোখ বেঁধে হাতে হাতকড়া পরিয়ে থানার এলাকায় অবস্থিত ওসির বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিপ্লবের ভাষ্য, সেখানে চোখের বাঁধন খুলে তাঁর দুই হাত বেঁধে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। সারাদিন এভাবে রাখার পর রাতে মোটা লাঠি দিয়ে তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয়। ওই সময় তাঁকে কোনো খাবারও দেওয়া হয়নি। রাত আনুমানিক ১১টার দিকে তৎকালীন পুলিশ সুপার আ স ম মাহাতাব উদ্দিন সেখানে পৌঁছালে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামানো হয়। এরপর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তাঁকে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিপ্লব আরও জানান, গভীর রাতে পুলিশ সদস্যরা তাঁকে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। পরে চোখ খুলে নিজেকে রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার বেড়িবাঁধ এলাকায় দেখতে পান। সেখানে তাঁকে মারধর করা হয় এবং হত্যার হুমকি দিয়ে শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাওয়া হয়।
তাঁর দাবি, এ সময় একজন গণমাধ্যমকর্মী পুলিশ সুপারকে ফোন করে তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলেও পুলিশ সুপার তা অস্বীকার করেন। পরে তাঁকে রামগতি থানায় নিয়ে আবারও নির্যাতন করা হয় এবং শরীরে ইনজেকশন পুশ করা হয়। এরপর সদর মডেল থানায় নেওয়া হলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় ওসি লোকমান তাঁর বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বিপ্লবের অভিযোগ, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে তাঁর বাবার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেন ওসি লোকমান। ছেলেকে হারানোর আশঙ্কায় তাঁর বাবা শেষ পর্যন্ত দেনদরবারের মাধ্যমে ৭০ লাখ টাকা দিতে রাজি হন। পরে বিপ্লব অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় তাঁর বাবার ওপর চাপ সৃষ্টি করে ওই টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিপ্লব বলেন, টাকা নেওয়ার পর তাঁকে আটটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এর মধ্যে দুটি মামলায় তাঁর ২০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছিল।
সাবেক এই শিবির নেতা অভিযোগ করেন, তৎকালীন সরকারের আমলে লক্ষ্মীপুরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন ওসি লোকমান। বর্তমানে তিনি পুলিশের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) উত্তরায় কর্মরত রয়েছেন বলে জানান বিপ্লব। তাঁর প্রশ্ন, দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও কীভাবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা পুলিশে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি লোকমান হোসাইনের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার সাবেক ওসি লোকমান হোসাইনের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। টাইমস টুডে
সদ্য সংবাদ/ এআর