সংসারের খরচ মেটানোর পর যা থাকে, তা থেকেই একটু একটু করে টাকা জমিয়ে রাখেন তাঁরা। কারও সঞ্চয় দিনে দুই টাকা, কারও পাঁচ, আবার কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী জমা রাখেন ১০ থেকে ২০ টাকা। মাটির তৈরি ছোট্ট ব্যাংকে জমতে থাকে সেই টাকা। তিন মাস পর ব্যাংকটি ভেঙে যা পাওয়া যায়, তা তুলে দেওয়া হয় গ্রামের পাঠাগারের উন্নয়নে। প্রতিটি ব্যাংকে জমে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। টাকার অঙ্কে সঞ্চয় সামান্য হলেও এর সঙ্গে মিশে আছে গ্রামের মানুষের ভালোবাসা, মমত্ববোধ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দর কিছু করার স্বপ্ন।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ইউনিয়নের টিপার বাজার এলাকার ‘সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগার’ ঘিরে গড়ে উঠেছে এমনই এক মানবিক উদ্যোগ। পাঠাগারের উন্নয়ন, নতুন বই ও বাদ্যযন্ত্র কেনা এবং ভবনের দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজে সহযোগিতা করতে মাটির ব্যাংকে টাকা জমাচ্ছেন ২০টি কৃষক পরিবারের সদস্যরা। এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও সামান্য সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে তাঁরা হয়ে উঠেছেন গ্রামের এই জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের অংশীদার।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগে এখন পর্যন্ত জমা হয়েছে ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা। পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা জামাল হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কৃষক পরিবারগুলোর জমিয়ে রাখা মাটির ব্যাংক থেকে এই অর্থ পাওয়া গেছে। তাঁদের প্রত্যাশা, ছোট ছোট সঞ্চয় একসময় পাঠাগারের বড় উন্নয়নকাজে ভূমিকা রাখবে।
২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারটির যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র ১০টি বই নিয়ে। স্থানীয় কলেজশিক্ষার্থী জামাল হোসেনের উদ্যোগে একটি ছোট ও জীর্ণ টিনশেড ঘরে এর কার্যক্রম শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পৃষ্ঠপোষকতায় পাঠাগারটি গ্রামের জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে বইয়ের সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে।
পাঠাগারটির রয়েছে নিজস্ব ভবন। দ্বিতল ভবনের ভিত্তির ওপর একতলার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০ লাখ টাকার বেশি। এর প্রায় ৯০ শতাংশ আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন ঢাকার রবিন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজ লিমিটেডের পরিচালক শাহীন হোসেন এবং মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। বাকি প্রায় ১০ শতাংশ অর্থ এসেছে স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকার মানুষের কাছ থেকে।
পাঠাগারে বই পড়ার পাশাপাশি কম্পিউটার ব্যবহার, ল্যাবের সুবিধা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ রয়েছে। চেয়ার-টেবিলের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বাংলা ও আধুনিক বাদ্যযন্ত্র। গ্রামের শিশু-কিশোর ও তরুণেরা এখানে বই পড়ার পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখে এবং সংগীতচর্চায় অংশ নেয়। ফলে পাঠাগারটি কেবল বই পড়ার জায়গা নয়, গ্রামের নতুন প্রজন্মের জ্ঞান ও সৃজনশীলতা বিকাশেরও একটি পরিসর হয়ে উঠেছে।
এই পাঠাগারের প্রতি ভালোবাসা থেকেই মাটির ব্যাংকে টাকা জমাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা দীপিকা রানী। তাঁর পরিবারের পক্ষে একসঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা সম্ভব নয়। তাই সংসারের খরচ মেটানোর পর সামান্য যা বাঁচে, তা-ই জমিয়ে রাখেন ব্যাংকে।
স্থানীয় বাসিন্দা মেরিনা বেগম বলেন, পাঠাগারে বই পড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ ঘটছে। তিনি বলেন, বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই মাটির ব্যাংকে সামান্য সঞ্চয় জমিয়ে পাঠাগারের উন্নয়নে সহযোগিতা করছি।
গ্রামের এই উদ্যোগের সুফল পাচ্ছে নতুন প্রজন্মও। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিমাই চন্দ্র রায় জানায়, তার মা মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে রাখেন। তিন মাস পর সেই ব্যাংক পাঠাগারে নিয়ে আসা হয়।
নিমাই বলে, আমরা নিয়মিত পাঠাগারে আসি। এখানে বই পড়ি, বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখি এবং সংগীতচর্চা করি। আমাদের গ্রামের এই পাঠাগারটি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা জামাল হোসেন প্রতিনিধিকে বলেন, মাত্র ১০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু করা পাঠাগারটিতে এখন ১৮ হাজারের বেশি বই রয়েছে। গ্রামের মানুষের মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে পাঠাগারের উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়টি তাঁকে অভিভূত করেছে। বর্তমানে ২০টি কৃষক পরিবার এ উদ্যোগে যুক্ত। তাঁদের প্রত্যেককে একটি করে মাটির ব্যাংক দিয়েছেন তিনি। গত নয় মাসে এসব ব্যাংক থেকে জমা হয়েছে ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা।
জামাল হোসেন বলেন, ‘দ্বিতল ভবনের কাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা এভাবে সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন। আমরা খুব দ্রুতই ভবনের দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজ শুরু করতে চাই।’
ঢাকার রবিন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজ লিমিটেডের পরিচালক শাহীন হোসেন বলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষের পাঠাগারের প্রতি এই মমত্ববোধই প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের বড় অনুপ্রেরণা।
সদ্য সংবাদ/এসকে