দুই বছর পরপর নির্বাচন হওয়ার নিয়ম থাকলেও উত্তরা ব্যাংক পিএলসির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) নির্বাচন হচ্ছে না প্রায় ১৭ বছর ধরে। সর্বশেষ ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর আর ভোট না হওয়ায় সংগঠনটির নেতৃত্ব ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন সিবিএ নেতার অভিযোগ, সর্বশেষ নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক হওয়া আবু মো. আহসানুল হাবিব দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাংকের নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার ও বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে প্রভাব বিস্তার, বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং নির্বাচন আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন হাবিব।
ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (রেজি. নং বি-১৯৩৬) সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৯ সালের ১২ মার্চ। ওই নির্বাচনে জালাল আহম্মদ সভাপতি এবং আবু মো. আহসানুল হাবিব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। শ্রম আইন অনুযায়ী দুই বছর পরপর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও এরপর আর নির্বাচন হয়নি।
সংগঠনটির কয়েকজন নেতার ভাষ্য, ২০০৯ সালের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আহসানুল হাবিব আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান। একপর্যায়ে ইউনিয়নের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময়ে তিনি একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করে ব্যাংকের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেন।
বিরোধিতা করায় তৎকালীন সিবিএ সভাপতি জালাল আহম্মদ, কার্যনির্বাহী সভাপতি মো. আব্দুল মোতালেবসহ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলায় কেউ কারাগারে যান, আবার কেউ দীর্ঘ সময় চাকরি থেকে বরখাস্ত ছিলেন বলে সাবেক নেতারা দাবি করেন।
সাবেক কার্যনির্বাহী সভাপতি মো. আব্দুল মোতালেব বলেন, একই কমিটিতে থাকা সত্ত্বেও তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা ও হামলা চালিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। তাঁদের দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হয়েছে এবং চাকরিও হারাতে হয়েছে। নির্বাচিত সভাপতি জালাল আহম্মদসহ সিবিএর অন্য নেতারাও একপর্যায়ে ব্যাংকে প্রবেশ করতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি।
সিবিএর এক নেতার অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আহসানুল হাবিব জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনোয়ার হোসাইনসহ শীর্ষ নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তাঁর দাবি, ব্যাংকে প্রভাব ধরে রাখতেই এ ধরনের তৎপরতা চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ফেসবুকে পাওয়া কিছু ছবিতে হাবিবকে ব্যাংকের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. মোসলেহ উদ্দিনসহ উত্তরা ব্যাংক আওয়ামী শ্রমিক লীগের নেতাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী পালনে অংশ নিতে দেখা যায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ওই নেতার আরও অভিযোগ, চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার ১০ দিনের মাথায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ওপর প্রভাব খাটিয়ে ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত গ্রেড-২ কর্মকর্তা হিসেবে হাবিবের চাকরির মেয়াদ দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক বাড়ানো হয়। এ পদে তাঁর বেতন প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা বলেও দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারী সিবিএ নেতাদের ভাষ্য, শ্রম আইন অনুযায়ী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কোনো ব্যক্তি ব্যাংকের ট্রেড ইউনিয়নের নেতা হতে পারেন না। অথচ আহসানুল হাবিব এখনো নিজেকে উত্তরা ব্যাংক শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, বিষয়টি শ্রম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সিবিএর কয়েকজন নেতার দাবি, গত এপ্রিল মাসে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ১২ জনকে চাকরি দেওয়ার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন হাবিব। পরে তাঁদের কয়েকজনকে ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে তাঁরা অভিযোগ করেন। এ ছাড়া টেন্ডার, বদলি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও তাঁর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক সভাপতি জালাল আহম্মদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতার অভিযোগ, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়। এসব মামলার পেছনে আহসানুল হাবিবের ভূমিকা ছিল বলে তাঁরা দাবি করেন। ওই সময়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে হাবিব নিজের প্রভাব বাড়িয়েছিলেন বলেও অভিযোগ তাঁদের।
তাঁদের আরও অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ও শ্রমিক লীগের নেতাদের ব্যবহার করে উত্তরা ব্যাংকের সিবিএ সভাপতি জালাল আহম্মদ, কার্যকরী সভাপতি এবং আরও একজন সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলা নম্বর ৩৩ (৮) ২০১৭-তে তাঁদের গ্রেপ্তারের পর চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করে ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বদলি করানোর অভিযোগও রয়েছে।
আহসানুল হাবিবের সঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সভাপতি মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাবেক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা পিয়াস এবং আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার একাধিক ছবি একটি দৈনিক পত্রিকার হাতে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে আহসানুল হাবিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এগুলো নিন্দুকদের বক্তব্য। তাঁর দাবি, শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে জালাল আহম্মদ নিজেই ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। পদত্যাগের তিন দিনের মধ্যে তিনি ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা নিয়ে চলে যান এবং এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র তিনি দেখাতে পারবেন বলেও দাবি করেন হাবিব। শ্রম আইন অনুযায়ী জালাল আহম্মদ এখন আর ইউনিয়নের কেউ নন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জালাল আহম্মদ ও মোতালেবসহ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় মামলা দিয়ে হয়রানি, জুলুম ও নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাবিব বলেন, ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর শ্রমিক দলের নেতাদের উপস্থিতিতে তাঁরা একটি অব্যাহতি কমিটি গঠন করেন। সেখানে মুসলেহ উদ্দিনকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। তাঁর দাবি, শ্রম আইন অনুসরণ করেই জালাল আহম্মদ ও মোতালেবকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সিবিএ নির্বাচন না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আহসানুল হাবিব বলেন, সব কথা মুঠোফোনে বলা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে সরাসরি দেখা করে কথা বলার অনুরোধ জানান তিনি।
অন্যদিকে অভিযোগগুলোর বিষয়ে উত্তরা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুল হাশেমের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, অফিসিয়াল জরুরি কাজে তিনি সাভারের ধামরাইয়ে অবস্থান করছেন। পরে সন্ধ্যায় তাঁর মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলে রাত ৮টার দিকে তিনি জানান, সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে আছেন এবং এ বিষয়ে তখন কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। সূত্র: কালবেলা
সদ্য সংবাদ/ এআর