সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘিরে চাপে পড়েছেন দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা। তাঁদের দাবি, এ সিদ্ধান্তের পর দেশীয় সুতার দাম প্রতি কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ সেন্ট বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও কঠিন হয়ে উঠছে। তবে বস্ত্রকল মালিকদের দাবি, সুতার দাম বৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা ও পোশাক কারখানার কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সমন্বিত নীতির প্রয়োজন দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা।
দেশে বর্তমানে এক হাজার ৮০০- এর বেশি টেক্সটাইল মিল রয়েছে। এর মধ্যে স্পিনিং বা সুতা উৎপাদনকারী মিলের সংখ্যা ৫২৭টি। এসব স্থানীয় মিল দেশের নিট পোশাকশিল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকশিল্পের প্রায় ৪০ শতাংশ সুতার চাহিদা পূরণ করে।
স্থানীয় সুতাকলকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে গত ৭ সেপ্টেম্বর ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সুতা আমদানির সুযোগ রাখা হয়। পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে প্রয়োজনীয় জামানত ও আর্থিক সক্ষমতা সবার নেই। ফলে বিকল্প উৎস থেকে সুতা সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যাংক গ্যারান্টি পেতে হলে ব্যাংকে জামানত বা কোল্যাটারাল সিকিউরিটি দিতে হয়। অনেক উদ্যোক্তার পক্ষে এ শর্ত পূরণ করা কঠিন।
এদিকে আমদানির সুযোগ সীমিত হওয়ার পর স্থানীয় বাজারে সুতার দাম বেড়েছে বলে দাবি পোশাক রপ্তানিকারকদের। তাঁদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে প্রতি কেজি ৩০ কাউন্টের কটন সুতার দাম ছিল ৩ ডলার ১৫ থেকে ৩ ডলার ২০ সেন্ট। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ ডলার ৫০ থেকে ৩ ডলার ৬০ সেন্টে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনী বলেন, বাড়তি দামে সুতা কিনে উৎপাদন ব্যয় বহন, পরিচালন খরচ মেটানো এবং ব্যাংকের উচ্চ মুনাফার চাপ সামলে কারখানা টিকিয়ে রাখা কঠিন।
তবে ভিন্ন অবস্থান বস্ত্রকল মালিকদের। তাঁদের মতে, বন্ড সুবিধা বাতিলের কারণে দেশীয় বাজারে স্থানীয় সুতার সরবরাহ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দর ও উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়েই সুতার দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে নজরদারিও রয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক সহসভাপতি সালেউদ জামান খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই স্থানীয় সুতার মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। সংগঠনের সদস্য মিলগুলোকে অতিরিক্ত দাম না নেওয়ার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের আদেশ স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, দেশীয় বস্ত্রশিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর জন্য প্রতিযোগিতামূলক দামে কাঁচামাল পাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি করা সুতার দাম কমলে দেশীয় উৎপাদকদেরও প্রতিযোগিতার স্বার্থে দাম সমন্বয়ের চাপ তৈরি হবে। তাই বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ বর্তমানে বছরে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে, যার বড় অংশ আসে নিটওয়্যার খাত থেকে। এ খাতের উৎপাদন ব্যয় ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গে সুতার দামের সরাসরি সম্পর্ক থাকায় আমদানি নীতি নিয়ে দ্রুত সমন্বিত সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সদ্য সংবাদ/এসকে