বয়স যখন ৬০-এর কাছাকাছি, তখন অনেকেই কর্মজীবন গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু গাজীপুরের বেলায়েত শেখের গল্পটা ভিন্ন। জীবনের দীর্ঘ বিরতির পর ৫০ বছর বয়সে ফের পড়াশোনায় ফিরেছিলেন তিনি। সেই যাত্রায় এবার যুক্ত হলো আরও বড় সাফল্য—৫৯ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি।
ঢাকার স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ থেকে অনার্স সম্পন্ন করেছেন বেলায়েত। ১৮ আগস্ট শেষ সেমিস্টারের ভাইভায় অংশ নিয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ হন তিনি।
তবে এখানেই থামতে চান না এই শিক্ষার্থী। স্নাতক শেষ করার পর মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার। এরপর মফস্বল সাংবাদিকতা নিয়ে পিএইচডি করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি কৃষক পরিবারে ১৯৬৮ সালে জন্ম বেলায়েত শেখের। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল তার। শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে সেই স্বপ্ন বারবার থমকে যায়।
১৯৮৩ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন বেলায়েত। পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য কিছু অর্থ জোগাড় করলেও অসুস্থ বাবার চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দিলে সেই টাকা সেখানেই ব্যয় করতে হয়। এরপর পরিবারের দায়িত্ব নিতে গিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘ কয়েক দশক পর ২০১৭ সালে আবার বই-খাতা হাতে নেন বেলায়েত। ৫০ বছর বয়সে ঢাকার দারুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নতুন করে শুরু করেন শিক্ষাজীবন।
দুই বছর পর ২০১৯ সালে জিপিএ ৪.৪৩ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২১ সালে জিপিএ ৪.৫৮ পেয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। তবে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয়নি তার।
পরে ২০২২ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, যোগাযোগ ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হন বেলায়েত। শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের নতুন অধ্যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বয়সের বড় ব্যবধানের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় দুর্বলতাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে অনুবাদসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। নিয়মিত গাজীপুর থেকে ঢাকায় এসে ক্লাস করেছেন। তরুণ সহপাঠীদের সঙ্গে ক্লাসের পাশাপাশি বিভিন্ন একাডেমিক কার্যক্রম ও স্টাডি ট্যুরেও অংশ নিয়েছেন।
বেলায়েতের শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক রিফাত সুলতানা বলেন, শেখার প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থেকে তিনি যে অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছেন, তা অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণাদায়ক।
পড়াশোনার পাশাপাশি সাংবাদিকতাও চালিয়ে যাচ্ছেন বেলায়েত। বর্তমানে তিনি দৈনিক করতোয়া পত্রিকার শ্রীপুর প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত। মফস্বলে সাংবাদিকতার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এ বিষয়ে উচ্চতর গবেষণার আগ্রহ তৈরি হয়েছে তার।
নিজের সাফল্য নিয়ে বেলায়েত শেখ বলেন, বয়সকে কখনোই শিক্ষার পথে বাধা হিসেবে দেখেননি তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নতুন কিছু শেখার ইচ্ছা রয়েছে তার।
তিনি আরও জানান, অনেক বাধা ও নানা ধরনের কথা শুনেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। এখন তার পরবর্তী লক্ষ্য মাস্টার্স শেষ করে এমফিল-পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া।
বেলায়েতের দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রা যেন একটি কথাই মনে করিয়ে দেয় শেখার জন্য বয়স কোনো সীমারেখা নয়। ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকেই নতুন করে স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু করা সম্ভব।
সদ্য সংবাদ/এসএস