কারাগারের কঠিন বাস্তবতা, একাকিত্ব আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজতে গিয়ে ধর্মের দিকে ঝুঁকছেন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বন্দী। তাঁদের কারও কাছে ইসলাম হয়ে উঠছে আত্মশুদ্ধির পথ, কারও কাছে শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনের অনুপ্রেরণা। তবে দেশটির কারাগারে প্রতি বছর কতজন বন্দী ইসলাম গ্রহণ করছেন, তার সুনির্দিষ্ট জাতীয় হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে বন্দীদের ধর্মীয় জীবন নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কারাগারে ধর্মান্তরের ঘটনা ঘটে এবং মুসলিম বন্দীদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। কিন্তু কারাগারে আগে থেকেই মুসলিম হিসেবে পরিচিত বন্দীদের সংখ্যা আর কারাবাসের সময় নতুন করে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা এক নয়। এ দুই বিষয় আলাদা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০১২ সালের একটি জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ১ হাজার ৪৭৪ জন পেশাদার কারা-যাজকের মতামত নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ জানান, তাঁদের কর্মস্থলের কারাগারে বন্দীদের ধর্ম পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। ধর্মান্তরের ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যাজকদের ৫১ শতাংশের পর্যবেক্ষণ ছিল, তাঁদের কারাগারে মুসলিম বন্দীর সংখ্যা বাড়ছে।
কারাগারে মুসলিমদের উপস্থিতি সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় নাগরিক অধিকার সংস্থা মুসলিম অ্যাডভোকেটসের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে। এতে ৩৪টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্টেট কারাগারে বন্দীদের মধ্যে মুসলিমদের হার প্রায় ৯ শতাংশ। ফেডারেল কারাগারে এ হার প্রায় ১২ শতাংশ। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ১ শতাংশ মুসলিম।
তবে এই পরিসংখ্যান দিয়ে কারাগারে ইসলাম গ্রহণকারীদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ, এসব তথ্য মূলত কারাগারে মুসলিম বন্দীদের সামগ্রিক উপস্থিতি তুলে ধরে; তাঁদের কতজন আগে অন্য ধর্মের অনুসারী ছিলেন বা কারাবাসের সময় ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তা নয়।
কারাগারে ইসলাম গ্রহণের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন বই ও পুরোনো প্রতিবেদনে বছরে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার বন্দীর ধর্মান্তরের দাবি করা হয়েছে। কিন্তু দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য গবেষণার অভাবে এসব সংখ্যার যথার্থতা নিশ্চিত করা যায়নি।
এ বিষয়ে নতুন করে মনোযোগ আকর্ষণ করে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রচারিত সিবিএস নিউজের ‘সিবিএস মর্নিংস’ অনুষ্ঠানের একটি প্রতিবেদন। এতে কারাবন্দীদের ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় সহায়তা প্রদানকারী অলাভজনক প্রতিষ্ঠান তাইবা ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম তুলে ধরা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের সেবার আওতায় এসেছেন ১৩ হাজারের বেশি বন্দী। সংস্থাটির দাবি, এই সেবাগ্রহীতাদের ৯০ শতাংশ কারাগারে থাকাকালে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তবে এটি একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সেবাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তথ্য। তাই এ পরিসংখ্যান দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সব কারাগারের চিত্র নির্ধারণ করা যাবে না।
কারাবাস মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে আমূল বদলে দেয়। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, স্বাধীনতা হারানো, মানসিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ অনেক বন্দীকে নিজের জীবন ও অতীত নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে মানসিক আশ্রয় ও নতুনভাবে পথচলার প্রেরণা খুঁজে পান।
ইসলামের নিয়মিত ইবাদত, আত্মসংযম এবং নৈতিক শিক্ষার চর্চা কিছু বন্দীর দৈনন্দিন জীবনে শৃঙ্খলা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায়, রোজা পালন এবং ধর্মীয় বই পড়ার মাধ্যমে তাঁরা সময়কে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ পান।
একই সঙ্গে জামাতে নামাজ, ধর্মীয় আলোচনা ও সহবন্দীদের সঙ্গে যোগাযোগ সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলতে পারে। কারাগারের বিচ্ছিন্ন পরিবেশে এই সম্পর্কগুলো কারও কারও জন্য মানসিক সমর্থনের উৎস হয়ে ওঠে।
আবার ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিবর্তন ব্যক্তিগত উপলব্ধি, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান কিংবা অতীতের ভুল সংশোধনের আকাঙ্ক্ষা থেকেও আসতে পারে। ইসলাম গ্রহণকারী প্রত্যেক বন্দীর অভিজ্ঞতা এক নয়; তাই সবার সিদ্ধান্তের পেছনে একই কারণ রয়েছে, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।
কারাগারে ধর্মীয় কার্যক্রমের সম্ভাব্য গুরুত্বের বিষয়টিও গবেষকদের আলোচনায় এসেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে ৭৩ শতাংশ কারা-যাজক মনে করেছিলেন, বন্দীদের সফল পুনর্বাসনে ধর্মভিত্তিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি ছিল সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মতামত, বন্দীদের পুনর্বাসনের ফলাফল পরিমাপ করা কোনো প্রত্যক্ষ গবেষণা নয়।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় কারাগারে ধর্মীয় চর্চার পাশাপাশি শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং মুক্তির পর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সমাজে ফিরে গিয়ে স্থিতিশীল জীবন গড়তে বন্দীদের বহুমুখী সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারগুলোতে মুসলিম বন্দীদের উপস্থিতি এবং কারাবাসের সময় ধর্ম পরিবর্তনের ঘটনা নিয়ে গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদন থাকলেও বছরে ঠিক কতজন ইসলাম গ্রহণ করেন, তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। তাই প্রচলিত বড় অঙ্কের দাবিগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে তথ্যের উৎস ও সীমাবদ্ধতা যাচাই করা জরুরি।
কারাগারে ইসলাম গ্রহণের প্রকৃত ব্যাপ্তি, এর পেছনের কারণ এবং বন্দীদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে প্রয়োজন আরও বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা।
সদ্য সংবাদ/এসএস