দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাবে তৈরি হওয়া লোডশেডিং খুব শিগগিরই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে আসবে বলে আশাবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, বিদ্যুৎ সংকটের চাপ যেন শুধু গ্রামাঞ্চলের মানুষের ওপর না পড়ে, সে জন্য শহর ও গ্রামের মধ্যে লোডশেডিং তুলনামূলকভাবে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
লোডশেডিং পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট বর্তমানে শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বব্যাপী একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে বর্তমানে যে পরিমাণ লোডশেডিং হচ্ছে, তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অনেকটা কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ঢাকাতেও কেন বেড়েছে লোডশেডিং
রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, অতীতে বিদ্যুৎ সংকটের সময় ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরকে তুলনামূলকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। ফলে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের চাপ বেশি পড়ত।
বর্তমান সরকার সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে জানিয়ে তিনি বলেন, সংকটের সময় বিদ্যুৎ ঘাটতির চাপ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও মানুষের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সমানভাবে ভাগ করে নেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এ কারণেই ঢাকাসহ বড় শহরেও এখন লোডশেডিং হচ্ছে।
তবে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় বড় শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রাধিকার দেওয়ার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আগের সময়ের লোডশেডিংয়ের তথ্য প্রকাশের উদ্যোগ
আগের সরকার এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের যে দাবি করা হয়েছিল, বাস্তবে তখন কতটা লোডশেডিং হয়েছিল তার তথ্যও জনগণের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, কোন সময়ে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল এবং এর প্রভাব কোন কোন এলাকায় পড়েছিল—এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের ওপর অতীতে তুলনামূলক বেশি লোডশেডিংয়ের চাপ দেওয়া হয়েছিল কি না, তাও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে।
আগামী সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ
বর্তমান পরিস্থিতির জন্য একাধিক কারণকে দায়ী করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ, সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাত সক্রিয় হওয়ায় বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় সরবরাহ সমন্বয়
লোডশেডিং ব্যবস্থাপনায় সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে জাহেদ উর রহমান বলেন, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় যেন দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন না থাকে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরবরাহের ক্ষেত্রে সমন্বয় করা হচ্ছে।
ডিপিডিসি ও ডেসকোর আওতাধীন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী লোডশেডিং করে সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎ দেশের অন্য অঞ্চলে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার দাবি, এর ফলে ঢাকার বাইরের শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহকদের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামাঞ্চলেও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ের চাপ কমানোর চেষ্টা চলছে।
লালদিয়া টার্মিনাল প্রকল্পের অগ্রগতি
প্রেস ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের অগ্রগতির কথাও জানান তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই ডেনমার্কের সহযোগিতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে প্রকল্প এলাকায় টার্মিনালের গ্রাউন্ডব্রেকিং অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া প্রকল্পটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ও পণ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলেও জানান তিনি।
দেশে সারের সংকট নেই: তথ্য উপদেষ্টা
দেশের সার পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন জাহেদ উর রহমান। তিনি দাবি করেন, দেশে বর্তমানে সারের মজুত নিয়ে কোনো সংকট নেই। তবে কিছু এলাকায় সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় সাময়িক সমস্যা দেখা দিয়েছিল, যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে বর্তমানে দেশে ১২ দশমিক ৮৬১ লাখ মেট্রিক টন সার মজুত রয়েছে। গত বছরের একই সময়ে মজুত ছিল প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন।
অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার সারের মজুত কম নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমস্যা মূলত মজুতের ক্ষেত্রে নয়; কোথাও কোথাও বিতরণ পর্যায়ে সাময়িক জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা হচ্ছে
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার ই-রিকশার সংখ্যা বাড়ায় সৃষ্ট ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা নিয়েও কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি জানান, ই-রিকশাকে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনতে কাজ চলছে। এ বিষয়ে গত ২৫ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের সভাকক্ষে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় ই-রিকশার কারিগরি ও যান্ত্রিক মানদণ্ড, চালকদের লাইসেন্স, যানবাহনের নিবন্ধন এবং কোন সড়ক বা এলাকায় এসব যান চলাচল করতে পারবে- এসব বিষয় নির্ধারণ করা হবে।
জাহেদ উর রহমান বলেন, ই-রিকশা বর্তমানে দেশের বাস্তবতার অংশ। তাই এটি পুরোপুরি বন্ধ বা উপেক্ষা না করে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কার্যকর নীতিমালা হলে ই-রিকশা ঘিরে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা অনেকটাই কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সদ্য সংবাদ/এসকে