দেশে হাম-রুবেলার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আবারও জোরদার করা হয়েছে টিকাদান কার্যক্রম। সারাদেশে চলমান বিশেষ হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনে এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৮৫ লাখ ৮৩৩ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বাদ পড়া ও নতুন জন্ম নেওয়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে এবার আরও ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে শুরু হয়েছে ক্যাচআপ কর্মসূচি।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬- এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ও সময়মতো টিকাদান কর্মসূচি চালু রাখা জরুরি। তবে ২০২০ সালের পর দীর্ঘ সময় টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই ঘাটতি পূরণে কাজ শুরু করে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৫ এপ্রিল থেকে ধাপে ধাপে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে ইউনিসেফের নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৮ জেলায় কার্যক্রম চালানো হয়। পরে ঢাকা ও আরও দুটি সিটি করপোরেশনকে যুক্ত করা হয়। নির্ধারিত সময়ের আগেই ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়।
এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত শিশুর সংখ্যার সঙ্গে হাম-রুবেলা টিকাদানের সংখ্যায় প্রায় ৪০ লাখের ব্যবধান পাওয়া যায়। বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করতে নতুন করে অনুসন্ধান চালানো হয়। এতে আরও প্রায় ১৪ লাখ শিশুকে খুঁজে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এরপরও হাম সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় নতুন করে ক্যাচআপ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ইউনিসেফ থেকে ১০ দিনের মধ্যে আরও ৪০ লাখ ডোজ টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। মজুত থাকা টিকার সঙ্গে নতুন ডোজ যুক্ত করে এবার ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ নতুন জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২৪ লাখ আগে বাদ পড়া শিশু রয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ক্যাম্প স্থাপনের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসন, সিভিল সার্জন, ইউএনও ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। কর্মজীবী মায়েদের সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে সরকারি ছুটির দিনেও টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সন্ধ্যার পরও নির্দিষ্ট স্থানে টিকাদান কার্যক্রম চালানোর কথা জানান তিনি।
ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির বিষয়টিও উদ্বেগের কারণ বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। চিকিৎসকদের মতে, হাম আক্রান্ত শিশুদের গুরুতর হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ নিউমোনিয়ার পাশাপাশি অপুষ্টি। পুষ্টির ঘাটতি থাকলে আক্রান্ত শিশুর দ্রুত শ্বাসকষ্টসহ জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে আইসিডিডিআরবির চিকিৎসক চিশতির উদ্ভাবিত স্বল্পমূল্যের বোতলভিত্তিক সিপ্যাপ পদ্ধতির কথাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। প্রায় ১৫০ টাকা ব্যয়ে তৈরি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গুরুতর শ্বাসকষ্টে থাকা শিশুদের অক্সিজেন সরবরাহে সহায়তা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশের ঘনবসতি হাম সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায় উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক। আক্রান্ত শিশুর কাছাকাছি থাকা, একই বিছানায় একাধিক শিশুর অবস্থান কিংবা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমান কর্মসূচির পরও প্রায় ১০ লাখ ডোজ টিকা মজুত থাকবে। ইতোমধ্যে ৪৩ লাখ ডোজ বিভিন্ন উপজেলায় পাঠানো হয়েছে, যা পরবর্তী মপআপ কার্যক্রমেও ব্যবহার করা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে হাম-রুবেলার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যেই নতুন এই কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।
সদ্য সংবাদ/এসকে