মাল্টার দাম কেজিতে ৫২০ টাকা- কেন এত বেশি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বাজারে সরবরাহ বাড়াতে দ্রুত ঋণপত্র (এলসি) খুলে মাল্টাসহ আমদানিনির্ভর ফল দেশে আনার জন্য ব্যবসায়ীদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি অস্বাভাবিক দামে ফল বিক্রির প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ফলের সরবরাহ ও বাজারদর পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
সভায় বর্তমান বাজারে মাল্টার দামের বিষয়টি আলোচনায় এলে বাণিজ্যমন্ত্রী আমদানিকারকদের কাছে এর ব্যাখ্যা জানতে চান। আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর, পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ হিসাব করার পরও কীভাবে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ৫২০ টাকা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো পণ্যের সরবরাহ কম থাকলে তার প্রভাব বাজারদরে পড়তে পারে। তবে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
মাল্টার বাজারদর অস্বাভাবিক হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেন তিনি।
সরবরাহের ঘাটতির কথা ব্যবসায়ীদের
সভায় ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় মাল্টার সরবরাহ কম। কোনো কোনো সপ্তাহে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার মাল্টা দেশে এসেছে। অথচ স্বাভাবিক চাহিদা পূরণে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টা প্রয়োজন বলে জানান তারা।
আমদানিকারকদের দাবি, উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের নানা জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেকে আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। এর সঙ্গে পচনশীল ফল হওয়ায় দীর্ঘ পরিবহন ও সংরক্ষণে বাড়তি ঝুঁকি রয়েছে।
শুল্ক পর্যালোচনার আশ্বাস
ব্যবসায়ীদের এসব সমস্যার কথা শোনার পর মাল্টার শুল্কসংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনার আশ্বাস দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি বিকল্প দেশ বা উৎস থেকে ফল আমদানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে মাল্টার সরবরাহ বাড়াতে ব্যবসায়ীদের দ্রুত এলসি খোলার তাগিদ দেওয়া হয়। আমদানির প্রক্রিয়াগত জটিলতা থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
খেজুর আমদানিতেও প্রস্তুতির নির্দেশ
আসন্ন চাহিদার কথা মাথায় রেখে ব্যবসায়ীদের এখন থেকেই খেজুর আমদানির প্রস্তুতি নিতে বলেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। খেজুরের শুল্কের বিষয়ে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই সরকারের সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে তিনি জানান।
খেজুরের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু বা শুল্কায়ন মূল্য নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা দূর করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করবে।
বিভিন্ন মান ও গ্রেডের খেজুরের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য যাচাই করে একটি যৌক্তিক নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরে সেই প্রস্তাব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে পাঠানো হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ীরা যেন অযৌক্তিক মূল্যায়নের মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পণ্যের প্রকৃত মূল্য কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগও বন্ধ রাখতে হবে।
সরকার ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষকে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কারসাজির কারণে বাজারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সভায় এনবিআরের প্রতিনিধি জানান, বিভিন্ন মানের খেজুরের আন্তর্জাতিক ক্রয়মূল্যে পার্থক্য রয়েছে। শুল্কায়নের ক্ষেত্রে সেই পার্থক্য যথাযথভাবে বিবেচনায় আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এদিকে খেজুর আমদানিকারকেরা জানান, আন্তর্জাতিক পরিবহন ও বন্দর ব্যবস্থাপনার নানা জটিলতায় পণ্য দেশে পৌঁছাতে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে। ফলে আসন্ন মৌসুমে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে শুল্কসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রয়োজন।
সভায় ব্যবসায়ীরা মাল্টাসহ বিভিন্ন বিদেশি ফলের আমদানি বাড়ানোর আশ্বাস দেন। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে শুল্ক-কর, শুল্কায়ন ও আমদানিপ্রক্রিয়ার যৌক্তিক সমস্যাগুলো পর্যালোচনার কথা জানানো হয়।
মতবিনিময় সভায় বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সদ্য সংবাদ/এসকে