মাদারীপুরের কালকিনিতে স্থানীয় দুই পক্ষের সংঘর্ষে বোমা বিস্ফোরণে আহত হয়েছিলেন মো. রায়হান। ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট চর ঠেঙ্গামারা এলাকায়। প্রতিপক্ষের ছোড়া ইটের আঘাতে তাঁর হাতে থাকা বোমাটি বিস্ফোরিত হলে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানসহ (নিটোর) কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন রায়হান।
তবে ওই বছরের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আহত হওয়ার দাবি করে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে তাঁর চিকিৎসার জন্য সরকারের অন্তত ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। গেজেটভুক্ত হওয়ার পর থেকে নিয়মিত সরকারি ভাতাও পাচ্ছেন তিনি।
রায়হানের পরিবারের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মাদারীপুর শহরের শকুনি লেকের পাড়ে পুলিশ ও বর্তমানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়েছিলেন তিনি। এ দাবি করেই তাঁর নাম সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। রায়হান কালকিনি পৌর এলাকার চর ঠেঙ্গামারা গ্রামের বাদশা হাওলাদার ও জাহেদা বেগমের ছেলে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য পরিবারের দাবির সঙ্গে মিলছে না। স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহিন বলেন, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট চর ঠেঙ্গামারা এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষ চলাকালে রায়হানের হাতে একটি বোমা ছিল। প্রতিপক্ষের ছোড়া ইটের আঘাতে সেটি বিস্ফোরিত হলে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
শাহিনের প্রশ্ন, ‘এখন শুনি তিনি জুলাই যোদ্ধা। এটা কীভাবে সম্ভব? মূলত এটা ছিল স্থানীয় দুপক্ষের দ্বন্দ্ব।’
কালকিনি পৌর এলাকার দক্ষিণ রাজদী গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর মোল্লাও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, স্থানীয়দের সংঘর্ষে আহত হয়েও রায়হান ‘জুলাই যোদ্ধা’ হয়েছেন।
চর ঠেঙ্গামারা গ্রামের আরও কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, জুলাই আন্দোলনের কোনো কর্মসূচিতে আহত হননি রায়হান। তাঁদের দাবি, ৮ আগস্ট স্থানীয় দুই পক্ষের সংঘর্ষেই তিনি আহত হন। বোমা নিয়ে এলাকায় সংঘর্ষে জড়ানোর কারণে অনেকে তাঁকে ‘বোমা রায়হান’ নামেও চেনেন।
অন্যদিকে, রায়হানের পরিবারের দাবি, ৫ আগস্ট মাদারীপুর শহরের শকুনি লেকের পাড়ে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় আহত হন তিনি। ঘটনার পর তাঁকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। পরে জুলাই আন্দোলনে আহত হিসেবে তিনি সরকারি চিকিৎসাসুবিধা পান।
তবে মাদারীপুর জেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব ও জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী কামরুল হাসান দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শকুনি লেক এলাকায় ছাত্রলীগ ও পুলিশের মধ্যে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।
রায়হানের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিতে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ঢাকার নিটোরে ভর্তি হন তিনি। স্থানীয়দের প্রশ্ন, ৫ আগস্ট আহত হয়ে থাকলে তিন দিন পর কেন হাসপাতালে ভর্তি হলেন?
জুলাই যোদ্ধা ও আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের তালিকা যাচাইয়ের দায়িত্বে ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি। জেলা প্রশাসক ছিলেন ওই কমিটির আহ্বায়ক এবং সিভিল সার্জন সদস্যসচিব। কমিটিতে ছাত্র প্রতিনিধিও ছিলেন দুজন।
যাচাইপ্রক্রিয়ায় যুক্ত ছাত্র প্রতিনিধি হাফেজ হাসিবুল্লাহ বলেন, উপজেলা পর্যায়ে তথ্য যাচাই করে জেলা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছিল। জেলা পর্যায়ে তাঁরা মূলত ওই তথ্যের ভিত্তিতেই স্বাক্ষর করেছেন। পাশাপাশি এনএসআই, ডিজিএফআই ও ডিএসবিসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমেও তদন্ত করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
মাদারীপুরের সিভিল সার্জন এবং সংশ্লিষ্ট যাচাই কমিটির সদস্যসচিব শরীফুল আবেদীন কামাল বলেন, ‘ঢাকা থেকে এটা অনলাইনে আপলোড হয়েছে। আমরা শুধু এখান থেকে স্বাক্ষর করে দিয়েছি।’
রায়হানের মা জাহেদা বেগম প্রথমে দাবি করেন, ৫ আগস্ট মাদারীপুর শহরের লেকের পাড়ে সংঘর্ষের সময় তাঁর ছেলে আহত হন। তবে পরবর্তী কথোপকথনে তিনি ৮ আগস্ট সংঘর্ষের বিষয়টি স্বীকার করেন।
রায়হানের বাবা বাদশা হাওলাদারও ছেলের ঘটনায় ‘ভুল হয়ে গেছে’ বলে স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, তাঁর ছেলে নিটোরে ভর্তি হয়েছিল। এরপর কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তাকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানেন না তিনি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে রায়হানের চিকিৎসায় সরকারের কমপক্ষে ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তিনি নিয়মিত সরকারি ভাতাও পাচ্ছেন।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকে রায়হান এলাকায় নেই বলে জানা গেছে। তাঁর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে কালকিনির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কিশোর কুমার দাশ বলেন, তিনি এ উপজেলায় নতুন যোগ দিয়েছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তবে খোঁজ নিয়ে ঘটনার তদন্ত করা হবে বলে জানান তিনি। সূত্র: এনপিবি
সদ্য সংবাদ/এআর