ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক আয়োজন ও নৌকাবাইচ বন্ধের বিষয়ে সংসদে দেওয়া বক্তব্য ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
শনিবার (২৯ আগস্ট) নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহিতা চেয়ে সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় তার বক্তব্যের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা ও আলেম-ওলামাদের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়ে থাকলে সে জন্য তিনি দুঃখিত।
হাসনাতের দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও সিনেমা কার্যত নিষিদ্ধের মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। সংসদে তিনি মূলত ওই বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চেয়েছিলেন। তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ কিংবা ধর্মীয় ব্যক্তিদের দায়ী করা ছিল না বলেও জানান তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের একটি কনসার্ট বন্ধ হওয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে হাসনাত বলেন, বিষয়টি গণমাধ্যমে যেভাবে এসেছে, পুরো ঘটনাটি তেমন ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের বেলায় উচ্চ শব্দে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছিল। এ কারণে কয়েকজন শিক্ষার্থী শব্দ কমানোর অনুরোধ করেন। পরে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হন।

এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা কনসার্ট বন্ধ করে দিয়েছিল এমন ধারণা সঠিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ এমন কোনো অবস্থাও নেই বলে উল্লেখ করেন হাসনাত।
নৌকাবাইচ নিয়ে নিজের বক্তব্যের একটি অংশে তথ্যগত ভুল হয়েছিল বলেও স্বীকার করেছেন তিনি। সিলেটের পরিবর্তে ভুলক্রমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম উল্লেখ করেছিলেন বলে জানান। এ ভুলের কারণে স্থানীয় মানুষের মধ্যে যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্যও তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
হাসনাত বলেন, সংসদে বক্তব্য দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সময় অল্প থাকায় ঘটনাগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং বক্তব্যের প্রেক্ষাপট তুলে ধরার সুযোগ পাননি। ফলে তার বক্তব্যের একটি অংশ ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, তিনি ও তার দল জুলাইয়ের আদর্শকে ধারণ করেন। এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে তারা, যেখানে ধর্ম, মত, সংস্কৃতি কিংবা জীবনযাপনের ধরন নিয়ে কারও ওপর অন্যের মত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিসরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে মসজিদ, মন্দির, মাজারের পাশাপাশি গান, কনসার্ট, ওয়াজ, মাহফিল, রথযাত্রা ও সিনেমা উৎসব সবই থাকবে। যে যার পছন্দের কর্মকাণ্ডে অংশ নেবে, আর অপছন্দের বিষয় থেকে দূরে থাকবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে সবার এই অধিকার নিশ্চিত করা।
কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন অন্যের অধিকার সীমিত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের বলেও মন্তব্য করেন হাসনাত। তার অভিযোগ, বর্তমান সরকার নাগরিকদের সেই নিরাপত্তা যথাযথভাবে দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, শ্রেণি বা গোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও পরিচয়ের মানুষ এতে অংশ নিয়েছিল। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়াই ছিল সেই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য। সেই ভিত্তিতে একটি সর্বজনীন বাংলাদেশ গঠনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
যে বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক
২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চান হাসনাত আবদুল্লাহ। ওই সময় তিনি জেলার গান-বাজনা ও নৌকাবাইচ বন্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন।
একই সঙ্গে ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কতটা সফল হয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শুক্রবার রাতে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। বিভিন্ন পক্ষ থেকে বক্তব্য প্রত্যাহারের পাশাপাশি দুঃখ প্রকাশের দাবিও জানানো হয়। এর পরদিন নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে দুঃখ প্রকাশ করলেন হাসনাত আবদুল্লাহ।