ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা পরিকল্পনা এবং ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের মধ্যে মৌলিক বিষয়ে এত বেশি দূরত্ব ছিল যে কোনো কার্যকর সমঝোতা হয়নি।
যুদ্ধবিরতি মানেই শান্তি নয়
বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৪৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সংঘাত-পরবর্তী শান্তিচুক্তির একটি বড় অংশই স্থায়ী হয়নি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়া বারবার ভেঙে পড়েছে।
যুদ্ধবিরতির পরও উত্তেজনা অব্যাহত
২০২৫ সালের জুনে ইরান–ইসরায়েল সংঘাত সাময়িকভাবে থেমে গেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এরপর ২০২৬ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি।
ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে মানবজীবন ও অর্থনীতিকে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী:
- ইরানে ১,৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ১৮,৫০০ আহত
- যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ সেনা নিহত এবং ৩০০-এর বেশি আহত
- কয়েক সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়
- বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম ৫৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়
ভূরাজনীতিতে নতুন বিভাজন ও অনিশ্চয়তা
এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যকে আমূল পরিবর্তন করছে। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল–আরব দেশগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা আব্রাহাম চুক্তির ভিত্তিও এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট একটি বড় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শান্তি প্রক্রিয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোর পরিবর্তে এখন পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ সমালোচনা
যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে। সাবেক মিত্র ও প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সমালোচনা প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হচ্ছে—বিশেষ করে যুদ্ধের লক্ষ্য, কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দুর্বলতা
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাজেট কমানো, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা এবং কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা হ্রাস—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক শান্তি কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ইতিহাসের শিক্ষা: সেই এথেন্সের সঙ্গে অদ্ভুত মিল
প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস বলেছিলেন, সামরিক শক্তি কখনো স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। অ্যাথেন্সের উদাহরণ দেখায়—অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধই একটি শক্তিশালী সভ্যতার পতন ডেকে আনতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত আপাতদৃষ্টিতে থেমে গেলেও এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক জোট, এবং নিরাপত্তা কাঠামো—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।