যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধ থামাতে একটি নির্দিষ্ট শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে গোপন আলোচনা এগোচ্ছে। প্রস্তাবিত এই সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করলে যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ফেরত পেতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা এবং আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুটি সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও চলতি সপ্তাহে দুই দেশের আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। শর্তাবলিতে সমঝোতা হলে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কট্টরপন্থী রিপাবলিকান নেতারা ও ইসরায়েল সম্ভাব্য চুক্তির বিরোধিতা করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, আগামী রোববার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে দ্বিতীয় দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এবং মিসর ও তুরস্কের সহায়তায় এই বৈঠকে চূড়ান্ত সমঝোতার চেষ্টা করা হবে।
আলোচনার মূল বিষয় হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের কাছে থাকা প্রায় দুই হাজার কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ প্রায় ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়াম নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে, যা ভূগর্ভে সংরক্ষিত বলে দাবি করছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরান বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে।
আলোচনার শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র মানবিক সহায়তার জন্য ছয় বিলিয়ন ডলার ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করলেও ইরান ২৭ বিলিয়ন ডলার দাবি করে। দীর্ঘ দর-কষাকষির পর বর্তমানে ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে অর্থ ব্যবহারের শর্ত এবং ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ওয়াশিংটনের প্রস্তাব ছিল, ইরান তাদের সব পারমাণবিক উপাদান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাবে। কিন্তু ইরান নিজ দেশে ইউরেনিয়ামের মান কমিয়ে আনতে রাজি হয়েছে। আপস প্রস্তাব হিসেবে উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো এবং বাকি অংশ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে ইরানেই কমিয়ে আনার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
তিন পৃষ্ঠার খসড়া চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে স্বেচ্ছা স্থগিতাদেশের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের মেয়াদ চাইলেও ইরান পাঁচ বছরের প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসা কাজে আইসোটোপ উৎপাদনের জন্য গবেষণামূলক রিঅ্যাক্টর ব্যবহারের অনুমতি এবং ভবিষ্যতের সব পারমাণবিক স্থাপনা ভূপৃষ্ঠে স্থাপনের শর্ত নিয়েও আলোচনা চলছে। বর্তমান ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো স্থায়ীভাবে অচল রাখার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন নিয়ে চুক্তিতে কোনো উল্লেখ আছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এ নিয়ে ইসরায়েল ও মার্কিন রিপাবলিকান নেতারা আপত্তি তুলেছেন। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির সময় অর্থ ছাড়ের সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প নিজেই, তাই এবার অর্থ ব্যবহারে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপের চেষ্টা চলছে।
মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, ইরান কিছুটা নমনীয় হলেও তা যথেষ্ট নয়। তাদের আরও এগিয়ে আনতে কী দরকার, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ইরান ২০ বিলিয়ন ডলার এবং নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই তেল বিক্রির সুযোগ চাইলেও পারমাণবিক কর্মসূচি ও হামাসের মতো গোষ্ঠীকে অর্থায়নের ইচ্ছা থেকে সরে আসেনি।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি আলোচনাকে ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করলেও বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান। অন্যদিকে সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম জানান, ট্রাম্প সরাসরি ইরানের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ফোনালাপটি উত্তেজনাপূর্ণ ছিল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে দুই পক্ষ। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার শক্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং নিউক্লিয়ার উপাদান হস্তান্তরেও সম্মত হয়েছে। চুক্তি না হলে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
এদিকে শুক্রবার তুরস্কে একটি কূটনৈতিক ফোরামের ফাঁকে পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক ও সৌদি আরবের কর্মকর্তারা চতুর্পক্ষীয় বৈঠকে বসবেন। সেখানে শান্তিপ্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।