উজবেকিস্তানে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে শতাধিক মানুষের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়। পরে পাসপোর্টে লাগিয়ে দেওয়া হয় উজবেকিস্তানের ভিসা। সেই ভিসা হাতে পেয়ে বিদেশযাত্রার প্রস্তুতি নিলেও বিমানবন্দরে গিয়ে তারা জানতে পারেন, ভিসাগুলো জাল।
শুধু বিদেশযাত্রা আটকে যাওয়াই নয়, টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে হুমকি, হয়রানি এবং মামলার মুখেও পড়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ঘটনার শুরুটা হয়েছিল স্বপ্ন দেখানোর মধ্য দিয়ে। উজবেকিস্তানে গার্মেন্টস খাতে চাকরির সুযোগ রয়েছে এমন প্রলোভন দেখিয়ে কয়েকজনের কাছ থেকে নেওয়া হয় টাকা। টাকা দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পাসপোর্টে আসে উজবেকিস্তানের ভিসা।
পাসপোর্টে ভিসা দেখে অনেকেই ধরে নেন, এবার বুঝি বিদেশযাত্রার স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে। শুরু হয় শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কেনা হয় বিমানের টিকিট। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিদায়ও নেন অনেকে।
কিন্তু সব প্রস্তুতি শেষে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে থমকে যায় সেই স্বপ্ন।

ভুক্তভোগী: মো:সুলতান
ভুক্তভোগীদের দাবি, ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়ানোর পর তাদের জানানো হয়, পাসপোর্টে থাকা ভিসা বৈধ নয়। অর্থাৎ উজবেকিস্তানের উদ্দেশ্যে তাদের আর যাওয়া হয়নি। বিমানবন্দর থেকেই ফিরতে হয় দেশে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের দিকে বাংলাদেশিদের জন্য উজবেকিস্তানের শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। সে সময় দেশটিতে বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। দক্ষ কর্মীদের চাহিদার পাশাপাশি ভালো বেতনের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, সেই সময়ের শ্রমবাজারের সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই পরবর্তী সময়ে কিছু মানুষকে উজবেকিস্তানে চাকরির কথা বলে প্রলুব্ধ করা হয়।
তবে বর্তমানে নির্দিষ্ট প্রকল্প ছাড়া বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য উজবেকিস্তানের শ্রমবাজারে আগের মতো সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তারপরও বিদেশে চাকরির আশায় থাকা মানুষের কাছে উজবেকিস্তানকে সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরে অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ভুক্তভোগীদের একজন ফিরোজা বেগম। দুই ছেলেকে উজবেকিস্তানে পাঠানোর আশায় তিনি ঋণ করে প্রায় সাত লাখ টাকা দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
তার ভাষ্য, সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলেদের কেউই বিদেশে যেতে পারেননি। এখন সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে তাকে কাজ করতে হচ্ছে।
ফিরোজা বেগম বলেন, কিস্তির টাকা জোগাড় করতে তিনি মানুষের কাছ থেকে সুদের ওপর টাকা নিয়েছেন। এখনও তার ঋণ রয়েছে। কিস্তি পরিশোধের জন্য তাকে হোস্টেলে রান্নার কাজ করতে হচ্ছে।
একদিকে সন্তানদের বিদেশযাত্রার স্বপ্ন পূরণ হয়নি, অন্যদিকে ঋণের বোঝা দুইয়ের চাপে এখন অসহায় এই পরিবার।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, উজবেকিস্তানে গার্মেন্টস কর্মী পাঠানোর কথা বলে তাদের কাছ থেকে অর্থ নেন অগ্রসর অ্যাপারেলসের মালিক মনোয়ার চৌধুরী।
তাদের দাবি, টাকা নেওয়ার সময় আস্থা তৈরির জন্য বিভিন্ন কৌশল নেওয়া হয়। স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে চুক্তিপত্র করা হয়। ওই সময় নুরুল হুদা নামে একজন আইনজীবীও উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তারা।
এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
তাদের দাবি, প্রায় ১০০ জনের কাছ থেকে সব মিলিয়ে প্রায় এক কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী আব্দুস সালাম অভিযোগ করেন, কেউ কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে টাকা দিয়েছেন, আবার কারও কাছ থেকে সরাসরি নগদ অর্থ নেওয়া হয়েছে।
তার দাবি, বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিউ টাওয়ারের ১৪ তলায় একটি অফিসে বসে এসব লেনদেন করা হতো। তিনি আরও অভিযোগ করেন, মনোয়ার চৌধুরীর নামে যে ব্যবসার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে সেই ব্যবসার কার্যক্রম তারা দেখতে পাননি।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, টাকা দেওয়ার পর তাদের পাসপোর্টে উজবেকিস্তানের ভিসা লাগিয়ে দেওয়া হয়। ভিসা পাওয়ার পর অনেকেই বিমানের টিকিট কাটেন।
কিন্তু বিমানবন্দরে গিয়ে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তারা জানতে পারেন, ভিসাগুলো বৈধ নয়।
ফলে বিদেশে যাওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়েও শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফিরতে হয় তাদের। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই ঘটনার পর তারা টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় নতুন করে হয়রানি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, মনোয়ার চৌধুরীর কাছে টাকা ফেরত চাইলে একের পর এক সময়ক্ষেপণ করা হয়। টাকা ফেরতের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
মনোয়ার চৌধুরীর ব্যবসায় সহযোগী হিসেবে তার বাবা জাহাঙ্গীর চৌধুরী এবং স্ত্রী রুবাইয়া আক্তারের নামও উল্লেখ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
তাদের অভিযোগ, টাকা ফেরতের বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তারা অর্থ ফেরত পাননি। বরং টাকা ফেরত চাওয়ার কারণে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন।
এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে দাবি তাদের। ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, বিদেশে পাঠানোর নামে টাকা নেওয়ার পর যখন তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তখন অর্থ ফেরতের বদলে উল্টো মামলা ও হুমকির মাধ্যমে তাদের চাপের মধ্যে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিদেশে যাওয়ার আশায় জমি-জমা বিক্রি, ধারদেনা কিংবা ঋণ করে টাকা দেওয়া অনেক মানুষের এখন একটাই দাবি—তাদের অর্থ ফেরত দেওয়া হোক এবং প্রতারণার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করা হোক।
বিশেষ করে যাদের ঋণ করে টাকা দিতে হয়েছে, তাদের অনেকেই এখন আর্থিক সংকটে পড়েছেন। বিদেশে গিয়ে আয় করে ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা থাকলেও বিমানবন্দর থেকেই ফিরে আসায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। তবে বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় অর্থ দেওয়ার আগে বৈধ রিক্রুটিং প্রক্রিয়া, ভিসার সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উজবেকিস্তানে চাকরির নামে অর্থ নেওয়া, জাল ভিসা সরবরাহ এবং পরবর্তী সময়ে হুমকি বা মামলার যে অভিযোগ উঠেছে এসবের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
সদ্য সংবাদ/এসএস