সাইবার সুরক্ষা, গুম প্রতিরোধ ও এসআরবি আইন নিয়ে উদ্বেগ অ্যামনেস্টির,আইনমন্ত্রীকে চিঠি

স
সদ্য সংবাদ ডেস্ক
২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:২২:৫৭
ছবি: সংগৃহীত

সাইবার সুরক্ষা (সংশোধনী), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) আইনমন্ত্রীকে পাঠানো এক চিঠিতে সংস্থাটি আইনগুলোর বিভিন্ন বিধান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক স্মৃতি সিং আইনমন্ত্রীকে চিঠিটি পাঠান। এতে বলা হয়, গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় সংস্থাটির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ডের সঙ্গে আইনমন্ত্রীর বৈঠকে যেসব উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এই চিঠি পাঠানো হয়েছে।

চিঠিতে অ্যামনেস্টি জানায়, বাংলাদেশে সম্প্রতি প্রস্তাবিত বা প্রণীত কয়েকটি আইন সরাসরি মানবাধিকারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, এসআরবি আইন এবং প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধনী) আইন নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়ে ‘গুরুতর উদ্বেগ’ রয়েছে সংস্থাটির।

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধনী) আইন, ২০২৬ সম্পর্কে অ্যামনেস্টি বলেছে, আগের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর মতো নতুন সংশোধনীতেও মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটির মতে, অতীতে এসব আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনের ৮(২) ধারায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বা অনুমোদিত যেকোনো সংস্থাকে জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা রাষ্ট্রীয় অবমাননার অজুহাতে ডিজিটাল কনটেন্ট সরিয়ে ফেলা বা বন্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ‘সরকারবিরোধী’ বা ‘মানহানি’র মতো অস্পষ্ট শব্দের অপব্যবহার করে সরকার ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমালোচকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

অ্যামনেস্টির মতে, আইনের এসব ধারায় ব্যবহৃত শব্দ ও সংজ্ঞা অস্পষ্ট এবং অত্যন্ত বিস্তৃত। রাষ্ট্র বা সরকারি কর্মকর্তাদের সমালোচনা নিষিদ্ধ করার মতো বিধান মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির তুলনায় বেশি মাত্রায় সমালোচনা সহ্য করার বিষয়টি স্বীকৃত। কিন্তু বাংলাদেশের প্রস্তাবিত আইনে সেই সুযোগ নেই।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত আইনের ৮(৪) ধারায় কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার পর তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীর ২৫ ও ২৬(এ) ধারায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘গুজব’, ‘বুলিং’, ‘হয়রানি’ বা ‘অপপ্রচার’ ছড়ানোর অভিযোগে ফৌজদারি অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। অ্যামনেস্টি প্রস্তাবিত আইনটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ করে এটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ পাস হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ গুম থেকে সব মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগ দেয়। এরপর ৮ সেপ্টেম্বর আইনটি পাস হয়।

তবে আইনটির বর্তমান রূপকে আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ক্ষেত্রে ‘সুযোগ হাতছাড়া’ হয়েছে বলে মনে করে সংস্থাটি।

আইনের ২(এইচ) ধারায় গুমের শিকার ব্যক্তি, তাঁর পরিবারের সদস্য ও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে অ্যামনেস্টি বলেছে, এই সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক কনভেনশনের ২৪(১) ধারার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে সংজ্ঞাটি সংশোধনের সুপারিশ করেছে তারা।

আইনের ৪ ধারায় গুমের সংজ্ঞায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকেই গুমের তথ্য গোপন করতে হবে—এমন শর্তকে অবাস্তব বলে উল্লেখ করেছে অ্যামনেস্টি। সংস্থাটির যুক্তি, গুমের ঘটনায় রাষ্ট্রের একাধিক বাহিনী বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত থাকতে পারে।

জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো আটক ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলেও তাঁর গ্রেপ্তার, অবস্থান বা অন্যান্য তথ্য গোপন রাখা হলে সেটিকে গুম হিসেবে বিবেচনা না করার বিধান নিয়েও সমালোচনা করেছে সংস্থাটি। এ বিধান আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দাবি করে তা বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি।

গুমের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়েও আপত্তি তুলেছে সংস্থাটি। সব পরিস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে অ্যামনেস্টি বাংলাদেশকে এ শাস্তি পুরোপুরি বিলোপের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

গুমের তদন্তের জন্য ৯০ দিন এবং প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন সময় নির্ধারণের বিধান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা। অ্যামনেস্টির মতে, গুমের মতো জটিল অপরাধের তদন্ত ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা তদন্তের মানকে প্রভাবিত করতে পারে। পুলিশের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

আইনের ৬ ধারায় গুমের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রাখার বিরোধিতা করেছে অ্যামনেস্টি। পাশাপাশি ২১ ধারায় ‘মিথ্যা বা হয়রানিমূলক’ গুমের অভিযোগ দায়ের করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান যুক্ত করাকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার চাওয়ার পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে তারা।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। চিঠিতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অ্যামনেস্টির ভাষ্য অনুযায়ী, এসআরবি আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে বিতর্কিত র‌্যাবের নাম পরিবর্তন করে বাহিনীটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, সম্পদ ও ক্ষমতা নতুন এসআরবি বাহিনীতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

আইনের ১২ ও ১৫ ধারায় বিশেষ বাহিনীটিকে তল্লাশি, বাজেয়াপ্তকরণ ও গ্রেপ্তারের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

আইনের ২৪ ধারার অধীনে এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে গঠিত ‘অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি’র স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অ্যামনেস্টি। চিঠিতে বলা হয়েছে, কমিটিতে এসআরবির কর্মকর্তা এবং সরকারের মনোনীত বিভিন্ন সদস্য থাকায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অ্যামনেস্টি বলেছে, এসআরবির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সেগুলোর স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। কোনো আচরণ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলে তা সাধারণ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

চিঠির শেষাংশে অ্যামনেস্টি বলেছে, মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে বাংলাদেশের উচিত জরুরি ভিত্তিতে আইনগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। একই সঙ্গে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ভবিষ্যতেও গঠনমূলক ও অর্থবহ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

সদ্য সংবাদ/ এআর

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. ব্যাটারিচালিত রিকশার সর্বোচ্চ গতি ২৫ কিমি, নিবন্ধন বাধ্যতামূলক-ফি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সদ্য. ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন বিজয়ী সদ্য. সাইবার সুরক্ষা, গুম প্রতিরোধ ও এসআরবি আইন নিয়ে উদ্বেগ অ্যামনেস্টির,আইনমন্ত্রীকে চিঠি সদ্য. আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী সংগঠন: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ সদ্য. বিদ্যুৎ উৎপাদনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেল রূপপুরের প্রথম ইউনিট সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি যাত্রায় বিঘ্ন, ফ্লাইটে দেখা দিল যান্ত্রিক ত্রুটি সদ্য. দুর্নীতি ও দেশপ্রেমের অভাবের কারণে মানবিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হয়নি: ডেপুটি স্পিকার সদ্য. পাবনায় শ্রমিক লীগ ও শ্রমিক দল নেতাকে গুলি করে হত্যা সদ্য. শনিবারের মধ্যে সরকারি বাসা থেকে ভাড়াটে অপসারণের নির্দেশ সদ্য. ৪ দিনের সফর শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. ব্যাটারিচালিত রিকশার সর্বোচ্চ গতি ২৫ কিমি, নিবন্ধন বাধ্যতামূলক-ফি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সদ্য. ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন বিজয়ী সদ্য. সাইবার সুরক্ষা, গুম প্রতিরোধ ও এসআরবি আইন নিয়ে উদ্বেগ অ্যামনেস্টির,আইনমন্ত্রীকে চিঠি সদ্য. আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী সংগঠন: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ সদ্য. বিদ্যুৎ উৎপাদনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেল রূপপুরের প্রথম ইউনিট সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি যাত্রায় বিঘ্ন, ফ্লাইটে দেখা দিল যান্ত্রিক ত্রুটি সদ্য. দুর্নীতি ও দেশপ্রেমের অভাবের কারণে মানবিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হয়নি: ডেপুটি স্পিকার সদ্য. পাবনায় শ্রমিক লীগ ও শ্রমিক দল নেতাকে গুলি করে হত্যা সদ্য. শনিবারের মধ্যে সরকারি বাসা থেকে ভাড়াটে অপসারণের নির্দেশ সদ্য. ৪ দিনের সফর শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান