নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ভাড়া বাসা থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফার্মেসি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলামের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর স্বামী নাজমুল আলমসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তাঁর বাবা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিষয়টি নিশ্চিত করেন ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজী সুমন মাহতাব।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন আব্দুর রহিম (৫০), আফরোজা বেগম (৪৫), সায়মা আক্তার (২৫), রাসেল (৪২), সাইফুল আলম (৩৬) ও রোকেয়া বেগম (৬৮)। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের সবার বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার নূরপুরের তালুকদার বাড়ি এলাকায়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে নাজমুল আলমের সঙ্গে ফারজানার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে নাজমুল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ফারজানার কাছে যৌতুক দাবি করে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর বাবা। এ ঘটনায় পারিবারিকভাবে সমঝোতার চেষ্টা করেও ফল না পেয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে একটি সিআর মামলা করেন। পরে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে ফারজানা আবার স্বামীর সঙ্গে সংসার শুরু করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, গত ২০ অক্টোবর ফারজানা তাঁর স্বামীর ফতুল্লার ভাড়া বাসায় যান। ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যার পর দাম্পত্য বিষয় ও আগের মামলা নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয় বলে বাড়ির অন্য ভাড়াটিয়া ও স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারেন তাঁর বাবা। এ সময় নাজমুল তাঁকে কটূক্তি করেন এবং সংসার করতে ভালো না লাগলে আত্মহত্যা করে মারা যেতে বলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহার অনুযায়ী, ওই দিন রাত ৯টার দিকে ফারজানার স্বামীর ভগ্নিপতি আব্দুর রহিম ফোন করে তাঁর বাবাকে জানান, ফারজানা শয়নকক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে শাড়ি পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছেন। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা বাসায় গিয়ে তাঁর মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
ফারজানার বাবা এজাহারে দাবি করেন, স্বামীর নির্যাতন ও প্ররোচনার কারণে তাঁর মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। এতে ফারজানার হাতে লেখা একটি চিরকুটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ফারজানার লেখা বলে দাবি করা ওই চিরকুটটি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এতে পারিবারিক কলহ, শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের আচরণ ও মানসিক কষ্টের কথা উল্লেখ রয়েছে। চিরকুটে ফারজানা তাঁর মৃত্যুর জন্য শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন সদস্যকে দায়ী করে তাঁদের বিচার আল্লাহর কাছে চেয়েছেন। পাশাপাশি তাঁকে নিজের বাড়িতে দাফন করার এবং নাজমুল যেন তাঁর মরদেহ স্পর্শ না করেন, সেই ইচ্ছার কথাও লিখেছেন। চিরকুটের শেষে বাবা-মা, ভাই ও ফয়সালের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।
তবে ফারজানার ভাই আরিফুল ইসলামের দাবি, চিরকুটটি আড়াই মাসেরও বেশি আগের লেখা। নাজমুল যখন পারিবারিক সমঝোতার মাধ্যমে ফারজানাকে ফিরিয়ে নিতে তাঁদের বাড়িতে গিয়েছিলেন, তখনও তিনি চিঠিটি দেখিয়েছিলেন বলে দাবি করেন আরিফুল।
ফারজানার পরিবারের অভিযোগ, মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে পুলিশ তাঁদের সহযোগিতা করেনি। ফারজানার বড় ভাই আরিফুল ইসলাম বলেন, “মামলা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ আমাদের অসহযোগিতা করেছে। প্রথমে তারা মামলা নিতে চায়নি। পরে এসপির সঙ্গে কথা বলার পর মামলা নিতে রাজি হয়। শুরুতে তারা ছেলেপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী এজাহার লিখে ফেলছিল। আমি গিয়ে বলি, ‘আমাদের কথা না শুনে আপনারা কীভাবে মামলা করেন?’ পরে একজন পুলিশ আমাদের বলে, এটাই এজাহারের কথা, কোনো পরিবর্তন করতে পারবেন না। পরে এজাহারের প্রথম অংশ পরিবর্তন করতে পারলেও নিচের অংশ পরিবর্তন করা যাবে না বলে জানান আনোয়ার নামের এক পুলিশ সদস্য। লাশ বাড়িতে নেওয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ির মধ্যে থাকায় এজাহারের বিষয়টি আমরা আর খেয়াল করতে পারিনি। তবে আমার মনে হয়, নিচের অংশটুকু ছেলেপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে লেখা হয়েছে। আমাদের সন্দেহ, ছেলেপক্ষের সঙ্গে পুলিশের বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে।”
চিরকুট উদ্ধারের বিষয়ে আরিফুল বলেন, “চিঠিটি আড়াই মাসেরও অনেক আগের লেখা। নাজমুল যখন ফারজানাকে সমঝোতার মাধ্যমে সংসারে ফিরিয়ে নিতে এসেছিল, তখন সে আমাকে চিঠিটি দেখিয়েছিল। তখন নাজমুল বলেছিল, চিঠিটা আরও অনেক আগের। প্রথমে আমরা লাশের পাশে কোনো চিঠি পাইনি। পুলিশকেও চিঠি উদ্ধার করতে দেখিনি। পরে পরিবারের সদস্যরা পুলিশের সঙ্গে বসার কিছুক্ষণ পর পুলিশ জানায়, ফারজানার পাশে একটি চিরকুট পাওয়া গেছে।”
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজী সুমন মাহতাব বলেন, “৩০৬ ধারায় আত্মহত্যার প্ররোচনায় মামলা হয়েছে। আমরা প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি। তদন্তে আরও কোনো আসামির নাম উঠে এলে তাঁদেরও গ্রেপ্তার করব। আমরা প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা মনে করছি। যদি এটি পরিকল্পিত হত্যা হয়ে থাকে, তাহলে ময়নাতদন্তে তা উঠে এলে আবার মামলা হবে।”
মামলা নিতে অসহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “এটা তাদের ভুল ধারণা। উল্টো আমি তাদের ফোন করে পাচ্ছি না। ফোন দিয়ে আমরা তাদের থানায় আনতে পারছিলাম না, এখন বলছে আমরা মামলা নিচ্ছি না। পাবলিক অনেক কথা বলে, কিছু করার নেই। তাদের অনেকগুলো ফোন দেওয়ার পরও দুই ঘণ্টা পর আসে।”
উল্লেখ্য, গত ২৪ অক্টোবর রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় স্বামীর ভাড়া বাসা থেকে ফারজানা ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ।
সদ্য সংবাদ/ এআর