শাহজালালে স্বর্ণের চোরাচালান: ধরা পড়ছে কেবল 'বাহক', অধরা মূল সিন্ডিকেট!

উ
উত্তরা (ঢাকা) প্রতিনিধি (এলেন বিশ্বাস
৫ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:১৯:৫১
ছবি: সংগৃহীত

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সিসিটিভি, এআই প্রযুক্তির ফেস রিকগনিশন ক্যামেরা, অত্যাধুনিক স্ক্যানার ও গোল্ড ডিটেক্টরসহ নানা ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রানওয়ে থেকে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের গ্রিন চ্যানেল পর্যন্ত গোয়েন্দা নজরদারিও রয়েছে। এরপরও থামছে না স্বর্ণ চোরাচালান। বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণের চালানসহ বাহকরা ধরা পড়লেও আড়ালে থেকে যাচ্ছেন মূল কারবারিরা।

সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর কাস্টমস হাউসের প্রিভেন্টিভ টিম চীন থেকে আসা দুই যাত্রীর কাছ থেকে ২৪ কোটি টাকা মূল্যের ১২ কেজি পেস্ট আকৃতির স্বর্ণ উদ্ধার করে। এর আগে ৪ অক্টোবর বিমানের দুই কর্মীর জুতা থেকে প্রায় ৯ দশমিক ৩৪ কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। এসব স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

কাস্টমস ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শাহজালাল বিমানবন্দরে ২৬ কেজি এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৮৭ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জব্দ করা হয়েছে ৬০ কেজির বেশি স্বর্ণ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, চোরাচালানের কৌশল প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশেষ করে দুবাই, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে আসা ফ্লাইটে স্বর্ণ পাচারের প্রবণতা বেশি। ফলের ক্যারেট, ল্যাপটপের ব্যাটারি, ট্রলির হাতল, কার্গো হোল্ড ও টয়লেট প্যানেলে লুকিয়ে স্বর্ণ আনা হচ্ছে। নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়াতে বহিরাগত বাহকের পাশাপাশি বিমানবন্দর ও উড়োজাহাজ সংস্থার অসাধু কর্মীদেরও ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক চক্রগুলো।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চোরাকারবারিরা স্বর্ণ হস্তান্তরে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ‘কাটআউট’ পদ্ধতি ও নির্দিষ্ট গোপন সংকেত ব্যবহার করে। ফলে গ্রেপ্তার হওয়া বাহকেরা অনেক সময় কেবল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। তাঁরা স্বর্ণের প্রকৃত মালিক সম্পর্কে জানেন না; তাঁদের কাছে থাকে শুধু নির্দিষ্ট সংকেত। বিমানবন্দর থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেও মূল চক্র ও স্বর্ণের গন্তব্য সম্পর্কে আশানুরূপ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে কাস্টমস ও শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, তাঁদের কঠোর নজরদারি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণেই বড় বড় চালান ধরা পড়ছে। তাঁদের মতে, আগের তুলনায় স্বর্ণ চোরাচালান কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, “চোরাকারবারিরা জানে, ধরা পড়ার আশঙ্কা বেশি। তারপরও কেন তারা স্বর্ণ নিয়ে আসছে, তা উদ্বেগের বিষয়। তারা বিমানবন্দরের কর্মীদেরও ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তবে তাঁরাও ধরা পড়ছেন। এমনও হতে পারে, এত নজরদারির পরও তারা পাচার করতে সক্ষম হচ্ছে।

“আসলে বাহকেরা ধরা পড়ছে। তারা এমন কাটআউট পদ্ধতি ব্যবহার করে যে, যার কাছ থেকে স্বর্ণ পেয়েছে, তাকেও ঠিকমতো চেনে না। পুরোনো পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট একটি সংকেত দেওয়া হয়। বিমানবন্দরের বাইরে সেই সংকেত ব্যবহার করে স্বর্ণ হস্তান্তর করা হয়। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে বাহক শুধু সংকেতের কথাই জানাতে পারে, এর বেশি কিছু নয়। এ কারণে মূল কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। মূল কারবারিদের ধরতে পারলে পুরো সিন্ডিকেটের সন্ধান পাওয়া যেত।”

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম বলেন, “স্বর্ণ জব্দের ঘটনায় থানায় মামলা হলে আমরা সেগুলো তদন্ত করি। আসামিদের রিমান্ডে নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আমরা স্বর্ণের মালিক ও গন্তব্য সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। কিন্তু আশানুরূপ ফল খুব একটা পাওয়া যায়নি। তবে দু-একটি ঘটনায় ভালো ফল পেয়েছি। কার্গোতে স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের পুলিশ সুপার (অপারেশনস) মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান বলেন, “বিমানবন্দর এলাকায় চুরিসহ অন্যান্য অপরাধ দমনে এয়ারপোর্ট এপিবিএন সর্বদা তৎপর এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে এয়ারপোর্ট এপিবিএন বদ্ধপরিকর। বিমানবন্দরকে ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ, জনহয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড, চুরি ও চোরাচালান প্রতিরোধে আমাদের অভিযান ও কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহার করে স্বর্ণ চোরাচালান বন্ধ করতে শুধু বাহক বা অসাধু কর্মীদের আটক করলেই হবে না। কার্গো, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত কর্মীদের নিয়মিত বদলি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে পুরো চোরাচালান চক্রকে শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে হবে।


​সদ্য সংবাদ/ এরআর

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. ইব্রাহিমের গোলে ভুটানকে হারিয়ে সাফে শুভসূচনা বাংলাদেশের সদ্য. বিনা জামানতে ২০ লাখ টাকার ঋণের বিষয়ে সতর্ক করল বাংলাদেশ ব্যাংক সদ্য. শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়নের অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীসহ শতাধিক ব্যক্তির হিসাব জব্দের নির্দেশ সদ্য. নতুন দায়িত্ব পেলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-অর্থমন্ত্রীসহ ৬ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সদ্য. ‘তিনি শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন, সব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী’: নাহিদ ইসলাম সদ্য. এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন সামান্তা শারমিন সদ্য. কক্সবাজারে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে গোলাগুলিতে সেনাসদস্য আহত, ৫৭ জন উদ্ধার সদ্য. আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন রোনালদো সদ্য. শ্রমিকদের দাবির আড়ালে সীমান্তের ওপার থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী সদ্য. প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানো হলো ৬ টাকা ৩২ পয়সা সদ্য. ইব্রাহিমের গোলে ভুটানকে হারিয়ে সাফে শুভসূচনা বাংলাদেশের সদ্য. বিনা জামানতে ২০ লাখ টাকার ঋণের বিষয়ে সতর্ক করল বাংলাদেশ ব্যাংক সদ্য. শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়নের অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীসহ শতাধিক ব্যক্তির হিসাব জব্দের নির্দেশ সদ্য. নতুন দায়িত্ব পেলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-অর্থমন্ত্রীসহ ৬ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সদ্য. ‘তিনি শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন, সব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী’: নাহিদ ইসলাম সদ্য. এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন সামান্তা শারমিন সদ্য. কক্সবাজারে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে গোলাগুলিতে সেনাসদস্য আহত, ৫৭ জন উদ্ধার সদ্য. আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন রোনালদো সদ্য. শ্রমিকদের দাবির আড়ালে সীমান্তের ওপার থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী সদ্য. প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানো হলো ৬ টাকা ৩২ পয়সা