বরিশাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। লটারিতে একটি প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়ার পরও অন্য ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ করানো, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় কৌশল অবলম্বন এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার গোষ্ঠীর যোগসাজশের অভিযোগ করেছেন সাধারণ ঠিকাদাররা।
তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে পরিবর্তনের কথা বলা হলেও বরিশাল গণপূর্ত কার্যালয়ে পুরোনো প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের একটি অংশ এখনো প্রভাব বিস্তার করছে। বড় অঙ্কের বেশ কয়েকটি প্রকল্প ঘুরেফিরে একই গোষ্ঠীর হাতে যাচ্ছে বলেও দাবি তাদের।
বরিশাল জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মেসার্স মুস্তাকিম বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মাহফুজ অভিযোগ করেন, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রায় ১৫ লাখ টাকার একটি এলটিএম কাজের দরপত্রে তার প্রতিষ্ঠান লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত হয়। কাজটির আইডি নম্বর ১২৫৭৬৪০।
তার দাবি, লটারিতে তার প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত হওয়ার পরও নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম মুস্তাকিম বিল্ডার্সকে কাজের ওয়ার্ক অর্ডার দেননি। এর আগেই তার মনোনীত বলে দাবি করা সিফাত নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে কাজটির একটি অংশ করিয়ে রাখা হয়।
মাহফুজের আরও অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে কাজ সম্পাদনের সন্তোষজনক সনদ দেওয়া হয়। এতে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
২০২৫ সালের মে মাসের আরেকটি দরপত্র নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ঠিকাদাররা। তাদের ভাষ্য, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেরামতকাজের একটি দরপত্রে ১১০৫২০৩ আইডির আওতায় ‘জেড আর এন্টারপ্রাইজ’ লটারিতে নির্বাচিত হয়।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটিকে অযোগ্য দেখিয়ে ‘এম এস খান এন্টারপ্রাইজ’কে কাজ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা। কী কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল এবং দরপত্র মূল্যায়নের প্রক্রিয়া কী ছিল, তা নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
বরিশাল গণপূর্তের কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে পাঁচটি মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটার, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভবন, আনসার কার্যালয়, উজিরপুর থানা ভবন এবং বিটেকসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্পের কাজ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে যাচ্ছে।
ঠিকাদার রিপন, কয়েস ও সরকারি বরিশাল কলেজের সাবেক ভিপি শাহীনসহ কয়েকজনের দাবি, দরপত্রে প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকলেও প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে এমন কৌশল নেওয়া হয়, যাতে নির্দিষ্ট ঠিকাদাররা সুবিধা পান।
তাদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গণপূর্তের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার জাকারিয়া। ঠিকাদারদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলীর দরপত্র-সংক্রান্ত পাসওয়ার্ড তার কাছে থাকে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ, মূল্যায়ন এবং দরপত্রের হিসাব-নিকাশেও তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
এমনকি নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী মূল্যায়ন না করে এস্টিমেট ও রেট কোড ব্যবস্থাপনায়ও তার ভূমিকা রয়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
ঠিকাদারদের একজন অভিযোগ করেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের পাসওয়ার্ড নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে থাকে এবং একটি কাজের বিপরীতে একাধিক লাইসেন্স ব্যবহার করে দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়।
তাদের ভাষ্য, কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে দরপত্রের রেট কোড আগে থেকে জানিয়ে দেওয়া হলে প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়। তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ তারা প্রকাশ্যে উপস্থাপন করেননি।
ঠিকাদারদের অভিযোগে ‘কাশি মিজান’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির নামও এসেছে। তাদের দাবি, তার কাছে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের পাসওয়ার্ড রয়েছে এবং বড় প্রকল্পের কাজ বণ্টনে তার প্রভাব রয়েছে।
সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঝালকাঠিতে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তা ও ঠিকাদার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারি কাজের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন। বর্তমানে তাদের একটি অংশ বরিশাল গণপূর্ত কার্যালয়েও একই ধরনের প্রভাব ধরে রেখেছে বলে অভিযোগ তাদের।
তাদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মুজিব কোট ও নৌকার ব্যাজ পরা একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের নাম রয়েছে বলে জানিয়েছেন মামলার বাদী মো. জহিরুল ইসলাম।
জহিরুল ইসলাম নিজেকে জুলাইয়ের আন্দোলনের একজন যোদ্ধা দাবি করে বলেন, ছাত্র-জনতার ওপর হামলার নেপথ্যে ফয়সাল আলমের ভূমিকা ছিল এবং তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষে আর্থিক সহায়তা করেছেন। তার অফিসকে দলীয় কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করা হতো বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বরিশাল কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মামুন উল ইসলাম বলেন, মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং তাদের ভূমিকা কী ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বরিশাল গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মুজিব কোট ও নৌকার ব্যাজ পরা ছবিটি এডিট করা।
দরপত্রের রেট কোড ফাঁস বা নির্দিষ্ট কাউকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার ভাষ্য, রেট কোড শুধু তার অফিসে থাকে এমন নয়; বিভিন্ন পর্যায়ে এটি থাকার সুযোগ রয়েছে। তিনি নিজে কাউকে রেট কোড সরবরাহ করেননি বলেও দাবি করেন।
সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন খান বিল্ডার্সের নাসির খান। তিনি বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া এবং আগের কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বিভিন্ন কাজ পেয়ে থাকে। এর বাইরে কোনো ধরনের বিষয় নেই বলে দাবি করেন তিনি।
বরিশাল জোনের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোক্তার দেওয়ানের সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে বলেন, শুধু ফোনে পুরো বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা সম্ভব নয়।
অভিযোগে উল্লেখ করা বিষয়গুলো সত্য হলে বরিশালে এসে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি পর্যালোচনা করার কথা জানান তিনি। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা।
গণপূর্তের সরকারি কাজ নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের পর দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, লটারিতে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে যথাযথভাবে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া এবং কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদার গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ঠিকাদাররা।
তাদের মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হবে এবং সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত উন্নয়নকাজে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সূত্র: দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি, আজকের ক্রাইম টাইমস, দৈনিক আজকালের কন্ঠ
সদ্য সংবাদ/এসএস