তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নির্ধারিত বৈঠক বাতিল হতে পারে বলে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছে বেইজিং। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জাপানের সংবাদ সংস্থা কিয়োদো নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের কথা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এক বছরের মধ্যে দুই নেতার এটি হবে তৃতীয় সরাসরি সাক্ষাৎ। তবে তাইওয়ান ইস্যুতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় প্রস্তাবিত বৈঠকটি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, চীন যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাইওয়ান বেইজিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘রেড লাইন’। তাইওয়ানের জন্য নতুন কোনো অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে শি-ট্রাম্প বৈঠক বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে চীন।
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠককে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এমন পরিস্থিতিতে বৈঠকটি শেষ মুহূর্তে বাতিল হলে তা মার্কিন প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে চীন। অন্যদিকে, দ্বীপটির আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজ ঘোষণা করে। ওই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বেইজিং।
এরপর চলতি বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিজেদের অস্ত্রের মজুত নিশ্চিত করতে তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের পৃথক একটি অস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
তবে চীনা সূত্রগুলোর দাবি, ওয়াশিংটন যদি নতুন করে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়, তাহলে শি-ট্রাম্প বৈঠক বাতিল করতে পারে বেইজিং।
এদিকে তাইওয়ান প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় চীনের সামরিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। গত জুলাইয়ে ২০২৪ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় চীন। এর ফলে তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
এর আগে শি জিনপিং ট্রাম্পকে জানিয়েছিলেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাইওয়ান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ ইস্যু ভুলভাবে মোকাবিলা করা হলে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছিলেন তিনি।
তবে তাইওয়ান ইস্যুতে উত্তেজনা বাড়লেও বেইজিং ও ওয়াশিংটন- দুই পক্ষই এমন কোনো পদক্ষেপ এড়িয়ে চলতে চাইছে, যাতে তাদের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক সমঝোতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চলতি বছরের মে মাসে চীন সফরের সময় ট্রাম্পও বলেছিলেন, তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি চীনের সঙ্গে আলোচনায় দর-কষাকষির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে।
১৯৭৯ সালে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র। একই বছর মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্টের আওতায় দ্বীপটির আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে ওয়াশিংটন।
তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি কতটা দৃঢ় থাকবে, তা নিয়ে দ্বীপটির মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও সংশয় বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শি-ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠকে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংঘাত চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও নতুন চাপ তৈরি করেছে। ইরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীন হওয়ায় তেহরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বেইজিংয়ের ওপরও পড়তে পারে।
সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, জুলাইয়ে তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার একটি হামলা চালাতে ইরান চীনের সরবরাহ করা স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করেছিল। তাদের দাবি, ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতে ইরানের প্রতি চীনের সহযোগিতার এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ। তবে ইরানকে উচ্চ রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ছবি সরবরাহের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে চীন।
এদিকে শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে এখনো চীনা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
সদ্য সংবাদ/এসকে