জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, “এখন বক্তব্য কী দেব? বক্তব্য তো প্রতিদিনই দিচ্ছি। এখন বক্তব্য দিলে মানুষ নিজের ওপর রাগ করলেও পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায়। মন খারাপ করার অধিকারও আপনার নেই। পকেটে টাকা নেই, মন খারাপ হয়েছে, এটাও আপনি বলতে পারবেন না। বললেও বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাবে।”
বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজধানীর জিরো পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে ৩০ অক্টোবরের বিক্ষোভ সমাবেশ সফল করার লক্ষ্যে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগকালে তিনি এসব কথা বলেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “উত্তর কোরিয়ায় নিয়ম আছে, ভোট কাকে দেবেন? দাঁড়াবেন একজন, ভোট তাঁকেই দিতে হবে। ভোট দেওয়ার পর আবার হাততালি দিতে হবে এবং খুশি দেখাতে হবে। বলতে হবে, আমি অনেক খুশি। এখন বিএনপি সরকারের আমলেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে মন খারাপ করার অধিকারও আপনার নেই। পকেটে টাকা নেই, মন খারাপ হয়েছে, এটাও আপনি বলতে পারবেন না। বললেও বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাবে।”
তিনি বলেন, “এই সরকার আট মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা ও নিজেদের মতপ্রকাশের জন্য মোট ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। অথচ তারেক রহমান নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, তিনি দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতাকে উৎসাহিত করেন। এটি মূলত ভোট আকর্ষণ ও ভোট পাওয়ার কৌশল ছিল। কিন্তু আজ তিনি প্রমাণ করছেন, তাঁর মতের বিরুদ্ধে কেউ অবস্থান নিলে তাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে মামলা দেওয়া হবে, জেলে ঢোকানো হবে। মামলা দিতে না পারলে আইজিপিকে দিয়ে ক্রসফায়ারের হুমকি দেওয়া হবে।”
আইজিপির বক্তব্যের সমালোচনা করে এনসিপির এই নেতা বলেন, “আমরা যখন এর প্রতিবাদ করব, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসে বলবেন, আইজিপি কিছু বোঝেন না, সরল মানুষ। সরল বিশ্বাসে ভুল করে কথা বলে ফেলেছেন। কয়েক দিন পর তিনি ভুল করে আরেকজনকে হত্যা করে ফেলবেন। তখন আবার বলা হবে, আইজিপি বুঝতে পারেননি, সরল মানুষ ভুল করে হত্যা করে ফেলেছেন। এই সরল বিশ্বাসের লোককে নিয়ে আমরা কী করব? আমরা তো এমন আইজিপি চাইনি।”
তিনি বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি পুলিশ বাহিনী, যারা জনগণের পুলিশ হবে, আইনের ধারক হবে এবং আইন বাস্তবায়ন করবে। আওয়ামী লীগের আমলে দীর্ঘ সময় পুলিশকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্তও পুলিশকে ব্যবহার করে বাহিনীটির মনোবল ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমরা সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন চেয়েছিলাম। অথচ আজও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।”
আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের সমালোচনা করে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “এই আইজিপি এত দিন বিদেশে পালিয়ে ছিলেন। বিদেশ থেকে ফিরে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁকে আইজিপি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রয়েছে। এই আইজিপিকে শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চান, অন্য কেউ চান না। কেউ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর লোক, কেউ প্রধানমন্ত্রীর লোক, কেউ আবার অন্য কারও লোক। বাংলাদেশের মানুষের লোক কেউ নন।”
তিনি বলেন, “সরকার যদি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে থাকে, তাহলে নতুন করে ক্রসফায়ার চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, সেই দুর্নীতিবাজ ও অযোগ্য আইজিপিকে অপসারণ করতে হবে।”
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, “পুলিশের ভাইদের বলব, আর কত তেলবাজি করবেন? আপনাদের শিক্ষা হওয়া উচিত। দিন শেষে আপনারা কী পান? জুনিয়র অফিসার ও কনস্টেবলরা কী পান? আপনাদের ব্যবহার করে কিছু কর্মকর্তা ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করেন। বেনজীর ও হারুনের মতো কর্মকর্তারা আপনাদের ব্যবহার করেছেন। রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে আপনাদেরই বিপদে পড়তে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “কনস্টেবল, এসআই ও জুনিয়র অফিসাররা, আপনারা দেশ থেকে পালাতে পারবেন না। যাঁরা আপনাদের ব্যবহার করছেন, তাঁরা পালিয়ে যেতে পারেন। আমরা শুনতে পাচ্ছি, আলী হোসেন ফকির অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি কেনা শুরু করেছেন। বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত। তাঁকে অনুসরণ করার দরকার নেই। আপনাদের চাকরি কোনো আইজিপির বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে না। আপনাদের দায়িত্ব আরও মহান। সংবিধান, বাংলাদেশের মাটি, মানুষ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা আপনাদের কাজ। জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে দিন শেষে বাংলাদেশে থাকা যায় না।”
রাজনৈতিক কর্মীদের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “আমরা যারা তৃণমূল থেকে উঠে এসেছি, আমাদের রক্তের দাম নেই। রক্তের দাম তাঁদের বেশি, যাঁরা সংকটের সময় বিদেশে পালিয়ে থাকেন, সন্তানদের বিদেশে রাখেন। সংকট কেটে গেলে দেশে ফিরে এসে সন্তানদের নেতা বানিয়ে দেন।”
তিনি বলেন, “রাজপথে শাকিলের মতো ছাত্রদলের নেতারা বছরের পর বছর জুলুম, হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। তাঁরা বাসায় ঘুমাতে পারেননি। তাঁদের লাশের মূল্য মাত্র ২০ লাখ টাকা। অথচ একজন সংসদ সদস্যের ছেলে গুলি করে মানুষ হত্যা করলে তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটি দেখতে চাই। একজন সংসদ সদস্যের ছেলে মানুষ হত্যা করলে ওই পদে তাঁর থাকার আর কোনো এখতিয়ার নেই। আমরা দেখতে চাই, তাঁর কতটুকু বিচার হয়।”
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা দীর্ঘ ১৭ বছর অনেক কষ্ট করেছেন। হলে থাকতে পারেননি, বাসায় যেতে পারেননি। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবরাও ভয় পেয়ে আপনাদের এড়িয়ে চলেছেন। অথচ আজ আপনাদের মূল্যায়ন নেই। দিন শেষে মন্ত্রীদের গাড়ির পেছনে দৌড়াতে হয়। কিছুদিন পর দেখবেন, মন্ত্রীর ছেলের গাড়ির পেছনেও দৌড়াতে হচ্ছে। যাঁদের ছেলেরা কোনো দিন রাজপথে নামেননি, তাঁদের পরিবারের জন্য আপনারা জীবন ও যৌবন দিয়ে রাজনীতি করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “অনেক রাজনীতিবিদ নিজেদের সন্তান ও পরিবারকে বিদেশে নিরাপদে রাখেন। তাঁদের সন্তানরা বিদেশের নাগরিক হন। আর দেশের ছেলেদের দিয়ে রাজনীতি করিয়ে তাঁদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা হয়। একসময় সেই নেতার ছেলেই আরেকজন কর্মীকে গুলি করে হত্যা করেন। দিন শেষে ২০ লাখ টাকা দিয়ে বিষয়টি শেষ করার চেষ্টা হয়। এটাই আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা।”
সদ্য সংবাদ/ এআর