তরুণ অফিসারদের র্যাবে প্রেষণে পাঠানো হলে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের আচরণে ভয়ংকর পরিবর্তন দেখা দিত, যেন তারা পেশাদার খুনিতে পরিণত হচ্ছে—এমন মন্তব্য করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। একই ধরনের প্রবণতা জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার, নন-কমিশন্ড অফিসার ও সাধারণ সৈনিকদের মধ্যেও লক্ষ্য করা গিয়েছিল বলে তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এসব তথ্য ট্রাইব্যুনালকে জানান।
শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানিতে এসব বক্তব্য তুলে ধরা হয়। বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে অভিযোগ গঠনের আদেশের জন্য আগামী ১৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করা হয়।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, বিচার চলাকালে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেবেন। তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া উল্লেখ করেছেন, সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছিলেন যে পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে গিয়ে সেনা কর্মকর্তারা নৈতিক বিচ্যুতির শিকার হচ্ছেন। তিনি চেয়েছিলেন, র্যাবে প্রেষণে থাকা কর্মকর্তাদের সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে আনা হোক। প্রধানমন্ত্রী তার কথায় সম্মতি জানালেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। জবানবন্দিতে আরও বলা হয়, র্যাবে প্রেষণে থাকা কর্মকর্তাদের দ্বারা সাধারণ নাগরিক, রাজনৈতিক কর্মী ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের অপহরণ ও হত্যার ঘটনা তাকে গভীরভাবে পীড়া দিত।
তাজুল ইসলাম আরও জানান, ইকবাল করিম ভূঁইয়া তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বলেন, তিনি তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল মুজিবকে ডেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ক্রসফায়ার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রথমদিকে ক্রসফায়ারের খবর না পাওয়ায় তিনি স্বস্তি পেলেও পরে বুঝতে পারেন, ঘটনাগুলো ঘটলেও সেগুলোর খবর চাপা দেওয়া হচ্ছে। কর্নেল মুজিব বদলি হওয়ার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে এবং বেনজীর আহমেদ র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর জিয়াউল আহসান এডিজির দায়িত্ব নেন।
জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, জিয়াউল আহসান তার আবাসিক ভবনে গার্ড রেখেছেন, বাসায় অস্ত্র ও সিসিটিভি স্থাপন করেছেন। এসব সামরিক বিধি লঙ্ঘনের কারণে তাকে সতর্ক করা হয়। পরবর্তীতে তার আচরণ আরও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে। ডিরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ও এএসইউ কমান্ড্যান্ট তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও তিনি তা মানেননি। একপর্যায়ে জিয়াউল আহসানকে ক্যান্টনমেন্টের একাংশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়।
জবানবন্দিতে আরও বলা হয়, নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল তারেক সিদ্দিকী ও তার ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে জিয়াউল আহসান সেনাপ্রধানের নির্দেশ অমান্য করতে শুরু করেন। সামরিক পুলিশের মাধ্যমে তার চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের পর তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং কিছুটা শৃঙ্খলায় ফেরেন, যদিও তাকে সেনাপ্রধানের কার্যালয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
শুনানিতে জিয়াউল আহসানের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও আইনজীবী নাজনীন নাহার অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন। মুনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বেশ কয়েকটিতে এর আগে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল এবং সাক্ষীরাও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেননি। দীর্ঘ ১৫ বছর পর এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এর জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কেন এত বছর বিচার হয়নি, তা সবারই জানা। সেই সময় এসব অভিযোগে চার্জশিট দেওয়া সম্ভব ছিল না বলেই বিচার বিলম্বিত হয়েছে।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আগামী ১৪ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের আদেশ দেওয়ার দিন ধার্য করেন। শুনানির সময় জিয়াউল আহসান কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হলে ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেয়।