সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ভাষণ শেষে নিজেকে স্বৈরশাসক বা একনায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সাধারণত তাকে একনায়ক বলা হয় এবং কিছু পরিস্থিতিতে এমন একজনের প্রয়োজনও পড়ে।
দাভোসে বক্তৃতা শেষ করার পর বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন ট্রাম্প। সেখানেই তিনি জানান, তার বক্তব্য ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। তিনি বলেন, নিজের বক্তৃতার এত প্রশংসা শুনে তিনি বিস্মিত। সাধারণত তাকে ভয়ঙ্কর স্বৈরাচারী হিসেবে চিত্রিত করা হলেও এবার সে ধরনের মন্তব্য শোনা যায়নি। ট্রাম্প বলেন, তিনি স্বৈরশাসক হলেও মাঝে মাঝে একজন স্বৈরশাসকের প্রয়োজন হয়।
নিজেকে স্বৈরশাসক হিসেবে আখ্যা দেওয়ার ঘটনা ট্রাম্পের ক্ষেত্রে নতুন নয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে তিনি ফক্স নিউজকে বলেছিলেন, ক্ষমতার প্রথম দিনের জন্য তিনি একনায়ক হবেন। এছাড়া গত বছরের অগাস্টে ওয়াশিংটনে কড়াকড়ি আরোপের সময়ও তিনি মন্তব্য করেছিলেন, অনেক আমেরিকান একজন স্বৈরশাসককে পছন্দ করতে পারে। পরে অবশ্য তিনি দাবি করেন, তিনি স্বৈরশাসক নন, বরং অত্যন্ত বুদ্ধিমান মানুষ।
ক্ষমতাধর ও কট্টরপন্থি নেতাদের প্রশংসা করাও ট্রাম্পের পরিচিত অভ্যাস। বিভিন্ন সময়ে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ‘জিনিয়াস’, চীনের শি জিনপিংকে ‘অত্যন্ত সম্মানিত’ এবং উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনকে ‘শক্তিশালী নেতা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
সম্প্রতি ট্রাম্পের একাধিক সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে সে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং বর্তমানে ভেনেজুয়েলার প্রশাসন কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে আলোচনা চলছে।
ইরানকে ধারাবাহিকভাবে হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেও বিশ্ব রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছেন ট্রাম্প। গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে তার কঠোর অবস্থানে একাধিক ইউরোপীয় দেশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি মিত্র দেশও রয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন দেশের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অনেকের মতে, এই একতরফা শুল্কনীতি ট্রাম্পের একনায়কসুলভ মানসিকতারই প্রতিফলন।
তবে ট্রাম্প বরাবরই বলে আসছেন, তার নীতির মূল কথা ‘আমেরিকা সর্বাগ্রে’, অর্থাৎ প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ, পরে অন্য দেশ। এই প্রেক্ষাপটে তার সাম্প্রতিক মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এর মধ্যেই গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে কয়েক সপ্তাহের হুমকির পর বৃহস্পতিবার নিজের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছেন ট্রাম্প। তিনি শুল্ক আরোপের হুমকি থেকে আপাতত বিরত থাকার ঘোষণা দেন এবং গ্রিনল্যান্ডে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও নাকচ করেন। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে একটি ‘ফ্রেমওয়ার্ক ডিল’ তৈরির পথে যুক্তরাষ্ট্র এগোচ্ছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
ট্রাম্পের এই আকস্মিক নমনীয়তায় আটলান্টিকের দুই পারের দেশগুলোর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।