কীটনাশকের বদলে কেরোসিন, মশা নিধনে কোটি টাকার বাণিজ্য মিজান চক্রের

স
সদ্য সংবাদ ডেস্ক
১৭ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:১৩:০০
ছবি: সংগৃহীত

ডেঙ্গুতে প্রতিবছর প্রাণহানি বাড়লেও মশা নিধনের কার্যক্রম ঘিরে উঠছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মশা নিধনের কীটনাশক সরবরাহে একক আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে মিজানুর রহমান ও তার সংশ্লিষ্ট চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে ভেজাল কীটনাশক সরবরাহের ঘটনায় একটি প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত হলেও নাম ও প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করে একই চক্র ফের সরকারি সরবরাহ ব্যবস্থায় সক্রিয় হয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অভিযোগ অনুযায়ী, মশা নিধনের নামে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যের পাশাপাশি কীটনাশকের মান, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন এবং কার্যকারিতা পরীক্ষার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মিজানুর রহমান এবং তার প্রতিষ্ঠান ‘দি লিমিট এগ্রো’। সংশ্লিষ্ট নথি ও অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহ করা কীটনাশকের বড় একটি অংশ পরীক্ষায় ভেজাল হিসেবে ধরা পড়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। পরে ২০১৯ সালে ভেজাল কীটনাশক সরবরাহ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কালো তালিকাভুক্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে অভিযোগ, কালো তালিকাভুক্তির পর থেমে থাকেনি সংশ্লিষ্ট চক্রের কার্যক্রম। পরিবর্তন করা হয় প্রতিষ্ঠানের নাম ও ব্যবসায়িক পরিচয়। নতুন নামে সামনে আসে ‘ফরওয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল’। অভিযোগ রয়েছে, আগের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই নতুন প্রতিষ্ঠানের আড়ালে আবারও সিটি করপোরেশনে কীটনাশক সরবরাহের ব্যবসায় যুক্ত হন।

প্রতিবছর ডেঙ্গুতে হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করলেও মশা নিধনের জন্য ঢাকা শহরে দুই সিটি করপোরেশন কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে। কিন্তু কীটনাশক কেনা থেকে শুরু করে সরবরাহ ও কার্যকারিতা পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগ থাকা সংশ্লিষ্ট চক্রটি পরবর্তী সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে তিনটি কার্যাদেশের মাধ্যমে প্রায় ৪৮ কোটি টাকার মশা নিধনের কীটনাশক সরবরাহের কাজ পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, এক সিটি করপোরেশনে কোনো প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পর একই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নতুন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অন্য সিটি করপোরেশনের সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো?

সরবরাহ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের নির্দিষ্ট হারে অর্থ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

মিজানের ভাষ্য অনুযায়ী, পিওন, কেরানি ও হিসাব বিভাগের সংশ্লিষ্টদের চেক নেওয়ার সময় নির্দিষ্ট শতাংশ দিতে হয়। তিনি এটিকে ‘ঘুষ’ হিসেবে উল্লেখ না করে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া অর্থ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনের এই ব্যবসার মাধ্যমে মিজান একসময় সিটি করপোরেশনের অফিসের পিওন থেকে জিএম এবং পরবর্তী সময়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছেন। অনুসন্ধানের সময় অর্থের বিনিময়ে সংবাদমাধ্যমকে প্রভাবিত বা ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টার অভিযোগও সামনে আসে।

শুধু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নয়, মশা নিধনের কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষার প্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তরের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের মশা নিধনের কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষার সময় যে কীটনাশক দেখানো বা ব্যবহার করা হয়, পরবর্তী সময়ে সরবরাহের ক্ষেত্রে সেটির পরিবর্তে অন্য পদার্থ দেওয়া হতে পারে।

দপ্তরের এক স্টোরকিপারের বক্তব্যে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। তার দাবি, পরীক্ষার সময় কীটনাশক ব্যবহার করা হলেও পরবর্তী সময়ে কৌশলে সরবরাহ করা হয় কেরোসিন।

তার আরও অভিযোগ, কীটনাশকের নামে কেরোসিন সরবরাহ করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একটি ব্যবস্থা রয়েছে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকে।

তিনি বলেন, এখানে কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। নিজের জীবনযাপন ও ব্যবহৃত সামগ্রীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের কথাও জানান।

মশা নিধনের কীটনাশক সরবরাহ, গ্রহণ ও পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কীটনাশক গ্রহণ, বিল পরিশোধ এবং পরীক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে একটি প্রভাবশালী চক্র কাজ করছে। নিম্নপদস্থ কর্মচারী থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি অংশ এই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত এমন অভিযোগও রয়েছে।

মিজানুর রহমানের সংশ্লিষ্টতা, অতীতে প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার অভিযোগ এবং পরবর্তীতে নতুন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দক্ষিণ সিটিতে কীটনাশক সরবরাহের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান ভান্ডার কর্মকর্তা বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়।

তিনি দাবি করেন, মিজানুর রহমান বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অতীতে কালো তালিকাভুক্ত হয়েছিল এমন তথ্য তাদের জানা নেই। এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্যও নেই বলে জানান তিনি।

তার ভাষ্য, ভেজাল কীটনাশক সরবরাহের সুযোগ নেই। কারণ সিটি করপোরেশন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই কীটনাশক গ্রহণ করে। ব্যক্তিকে বিবেচনা করে নয়, পণ্যের মান যাচাই করেই কীটনাশক নেওয়া হয়।

তবে এখানেই সামনে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-যে পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে কোটি কোটি টাকার কীটনাশক গ্রহণ করা হচ্ছে, সেই পরীক্ষা কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ?

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া পরীক্ষার নমুনা এবং পরবর্তী সময়ে বড় পরিসরে সরবরাহ করা পণ্য একই কি না তা নিশ্চিত করার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

যদি পরীক্ষার সময় একটি পণ্য এবং পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো পদার্থ সরবরাহের সুযোগ থাকে, তাহলে শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে কীটনাশকের প্রকৃত মান নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে এ ধরনের সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় নমুনা সংগ্রহ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, সংরক্ষণ এবং সরবরাহ করা পণ্যের সঙ্গে পরীক্ষিত নমুনার মিল নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

নথিপত্র ও অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে কালো তালিকাভুক্তির অভিযোগ থাকা সংশ্লিষ্ট চক্রটি পরবর্তীতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে তিনটি কার্যাদেশে প্রায় ৪৮ কোটি টাকার মশা নিধনের কীটনাশক সরবরাহের কাজ পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

দেশে প্রতিবছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বহু মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন এবং প্রাণ হারাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে মশা নিধন কার্যক্রমে বরাদ্দ করা অর্থের প্রতিটি টাকা কার্যকরভাবে ব্যয় হওয়া জরুরি।

কিন্তু কীটনাশক সরবরাহে অনিয়ম, নিম্নমানের পণ্য, কেরোসিন সরবরাহ, ঘুষ বা আর্থিক সুবিধা এবং কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের নতুন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারি কার্যাদেশ পাওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আর্থিক অনিয়মের বিষয় নয় এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বিশ্লেষকদের মতে, মশা নিধনের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে, তা যদি কার্যকর কীটনাশকের পরিবর্তে অনিয়মের মাধ্যমে অপচয় হয়, তাহলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ মশা নিধনের নামে সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা নিম্নমানের কীটনাশক সরবরাহের ঘটনা সত্য হলে এর দায় শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও জীবনঝুঁকির ওপরও।

সদ্য সংবাদ/এসএস

অপরাধ ব্রেকিং

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. সিসিইউতে ভর্তি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান সদ্য. আজ থেকে ঢাকা-দাম্মাম রুটে ফ্লাইট চলাচল শুরু সদ্য. মোংলায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. খুলনায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. পথের ধারে পিঠা বিক্রি করতে হলেও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক সদ্য. উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হলো ভূমিমন্ত্রীকে সদ্য. মাসে ২০-২২টি বুকিং থাকত অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরের সেই ফ্ল্যাটে সদ্য. কক্সবাজারে সমুদ্রে গোসলে নেমে ৩ পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ ৩ সদ্য. সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে তরুণ প্রজন্মকে সোচ্চার থাকার আহ্বান রাষ্ট্রপতির সদ্য. আখচাষিদের প্রণোদনা তালিকায় প্রথম স্থানে বিএনপির এমপি চাঁদের নাম সদ্য. সিসিইউতে ভর্তি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান সদ্য. আজ থেকে ঢাকা-দাম্মাম রুটে ফ্লাইট চলাচল শুরু সদ্য. মোংলায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. খুলনায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সদ্য. পথের ধারে পিঠা বিক্রি করতে হলেও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক সদ্য. উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হলো ভূমিমন্ত্রীকে সদ্য. মাসে ২০-২২টি বুকিং থাকত অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরের সেই ফ্ল্যাটে সদ্য. কক্সবাজারে সমুদ্রে গোসলে নেমে ৩ পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ ৩ সদ্য. সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে তরুণ প্রজন্মকে সোচ্চার থাকার আহ্বান রাষ্ট্রপতির সদ্য. আখচাষিদের প্রণোদনা তালিকায় প্রথম স্থানে বিএনপির এমপি চাঁদের নাম