মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত শিশুদের সুরক্ষা, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ইসলামী আলোচক মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী। তাঁর মতে, ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে মাদ্রাসাগুলোতে কার্যকর তদারকি ও সময়োপযোগী সংস্কার প্রয়োজন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে এসব বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আজহারীর বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু মাদ্রাসা ও হিফজখানায় শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা থেকে শুরু করে পাঠদান পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করতে নিবন্ধন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যক্রম, অবকাঠামো এবং পরিচালনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা এবং অনিয়মের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
শিশুদের মানসিক বিকাশের বিষয়টি সামনে এনে আজহারী বলেন, শিক্ষকতার দায়িত্ব পালনের জন্য শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের বয়স, মানসিক অবস্থা ও আবেগ উপলব্ধি করে পাঠদানের সক্ষমতাও থাকতে হবে। এ কারণে শিক্ষকদের জন্য শিশু মনস্তত্ত্ব, আচরণবিধি ও শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার লিখিত নীতিমালা থাকা উচিত। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণের সীমা, অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি, তদন্তের প্রক্রিয়া এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
শাসনের নামে শারীরিক নির্যাতন, বেত্রাঘাত কিংবা অপমানজনক আচরণের বিরোধিতা করে আজহারী বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা গড়ে তোলার পদ্ধতি হতে হবে মানবিক ও বয়সোপযোগী। ভয়ভীতি বা মানসিক আঘাতের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
শিশু নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা গোপন না রেখে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগকারীর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠা এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণের এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার, যেখানে শিশুরা ভয় বা চাপ ছাড়াই নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে পারবে। পাশাপাশি গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের শিশুদের সংস্পর্শে থাকা দায়িত্বে পুনর্নিয়োগ ঠেকাতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের কথাও বলেন তিনি।
মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে আজহারী আলেম-উলামা, শিক্ষক, অভিভাবক, পরিচালনা কমিটি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ভূমিকার ওপর জোর দেন। আর্থিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আজহারীর মতে, মাদ্রাসায় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার অর্থ ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়। বরং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পাঠদানের মান বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা শক্তিশালী করাই এর উদ্দেশ্য। ভুল ও সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা দায়িত্বশীলতার অংশ।
শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দ্বীনি শিক্ষার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এই ইসলামী আলোচক।
সদ্য সংবাদ/এসএস