বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। কোটি কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের অনেক সময় ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে সম্মান জানানো হয়। প্রবাসীদের দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে আরও সম্পৃক্ত করার নানা উদ্যোগের কথাও বলা হয়।
কিন্তু দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে বিমানবন্দরে নেমেই যদি লাগেজ নিয়ে ভোগান্তি ও চুরির শিকার হতে হয়, তাহলে সেই প্রবাসীদের মনে তৈরি হয় তীব্র হতাশা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা, মূল্যবান মালামাল খোয়া যাওয়া এবং লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
ডেনমার্ক প্রবাসী দিল মোহাম্মদ বাবু প্রতিবছরই দেশে আসেন। এবারও বিমানবন্দরে নামার পর লাগেজ সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখতে পান, তার সাতটি লাগেজের মধ্যে দুটি ভাঙা। এর মধ্যে একটি লাগেজের অবস্থা ছিল খুবই নাজুক।
তার অভিজ্ঞতা শুধু একজন প্রবাসীর নয়। বিমানবন্দরে লাগেজ নিয়ে হয়রানি ও মালামাল চুরির অভিযোগ করে আসছেন অনেক যাত্রী।
ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক সময় লাগেজ পেতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আবার কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও লাগেজ পাওয়া যায় না। লাগেজ হাতে পাওয়ার পরও দেখা যায়, তালা ভাঙা কিংবা ব্যাগ কেটে ভেতরের মূল্যবান মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব ঘটনা ঘটলেও কার্যকরভাবে বন্ধ হচ্ছে না লাগেজ কাটা ও মালামাল চুরির ঘটনা। মাঝেমধ্যে কর্তৃপক্ষ অভিযান চালালেও কিছুদিন পর আবারও একই ধরনের অভিযোগ সামনে আসে।
শুধু বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময় নয়, দেশ থেকে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রেও লাগেজ খোয়া যাওয়া কিংবা মালামাল চুরির অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ভিআইপি যাত্রীরাও এর বাইরে নন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
শুধু যাত্রীদের লাগেজ নয়, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজেও মূল্যবান পণ্য চুরির অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ফরওয়ার্ডিং কোম্পানি ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে এ নিয়ে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, চক্রের সদস্যরা আগেই জেনে যায় কোন চালানে দামি বা আকর্ষণীয় পণ্য রয়েছে। এরপর কার্গো ভিলেজে পণ্য পৌঁছানোর পর পর্যাপ্ত নজরদারির ঘাটতি, সিসিটিভি কভারেজের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগ নিয়ে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
বিশেষ করে আকারে ছোট কিন্তু দামি পণ্যগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকে বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।
বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন বিপুলসংখ্যক লোডার। যাত্রীদের ব্যাগেজ ও ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে তাদের ওপর।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, লোডার নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এসব অভিযোগের কারণে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কার্গো থেকে পণ্য চুরির পর বিষয়টি জানাতে গেলেও সহজে সমাধান পাওয়া যায় না। কখনো চুরি যাওয়া পণ্য ফেরত পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত একই চালানের অন্য পণ্য খালাস নিয়েও জটিলতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনেক ব্যবসায়ী আবার অতিরিক্ত হয়রানির আশঙ্কায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতেও আগ্রহী হন না। ফলে প্রকৃত চুরির সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবা উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিভিল এভিয়েশনের নজরদারি, বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষণ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, সিসিটিভি মনিটরিংসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও যাত্রী হয়রানি ও লাগেজ নিয়ে অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু অভিযান চালালেই হবে না। লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের প্রতিটি ধাপে কারা দায়িত্ব পালন করছেন, কোথায় লাগেজ যাচ্ছে এবং কোন পর্যায়ে মালামাল খোয়া যাচ্ছে এসব বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সদ্য সংবাদ/এসএস