রাজধানীর খিলক্ষেতের পুলিশ অফিসার হাউজিং সোসাইটিতে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া একটি ফ্ল্যাটে নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো বলে অভিযোগ উঠেছে। উচ্চ শব্দে গান-বাজনা, নাচ ও মাদক সেবনের এসব আয়োজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুব্ধ ছিলেন আবাসিক এলাকার অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রায় এক বছর ধরে মাসে ২০ থেকে ২২ দিন ওই ফ্ল্যাটে পার্টি চলত। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ায় তাঁরা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও অভিযোগ জানিয়েছিলেন।
সোমবার রাতে ফ্ল্যাটটিতে অভিযান চালিয়ে ৮৫ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে আটক ব্যক্তিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানিয়েছে, অভিযানে মদ, ইয়াবা, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম এবং অল্প পরিমাণ গাঁজাসদৃশ পদার্থ উদ্ধার করা হয়েছে।
বুধবার মিন্টো রোডে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের অভিযানের বিস্তারিত জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবির। তিনি বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতে তাঁর কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না। পরে তাঁকে অভিযানে যুক্ত করা হয়।
ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি বর্ণনা করে ইলিয়াস কবির বলেন, হাউজিং সোসাইটির ভেতরে একটি মসজিদের আশপাশ থেকেও জোরে গান শোনা যাচ্ছিল। সেখানে প্রায় ২২টি গাড়ি ছিল। অভিযানের সময় ২৬ জন তরুণীসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারদের পাওয়া যায়।
ডিসির ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্ল্যাটে সিসা সেবন, উচ্চ শব্দে গান ও অশালীন নাচ চলছিল। পুলিশ প্রবেশ করলে উপস্থিত ব্যক্তিরা দৌড়ে ভবনের ওপরের তলায় চলে যান। কয়েকটি কক্ষে নারী ও পুরুষকে একসঙ্গে পাওয়া যায়।
দীর্ঘদিন ধরে এসব আয়োজনের কারণে আবাসিক এলাকার অন্য বাসিন্দারা বিরক্ত ছিলেন বলে অভিযানে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, পার্টির শব্দ আশপাশের বাড়িঘর এমনকি মসজিদ পর্যন্ত পৌঁছাত। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগও করা হয়েছিল।
অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা ব্যবহার করে পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের নিবন্ধন করা হতো বলে জানিয়েছেন ইলিয়াস কবির। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ফ্ল্যাটটির মূল হোস্ট ছিলেন অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির এবং কো-হোস্টের দায়িত্বে ছিলেন মাহবুবুল আলম।
মাহবুবুল আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিসি বলেন, ২০২৫ সাল থেকে ফ্ল্যাটটিতে এ ধরনের আয়োজন হয়ে আসছিল। প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টি আয়োজনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
অর্থ আদায়ের বিষয়ে ইলিয়াস কবির জানান, ১০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ১৮ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আরও প্রায় ৯০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০০ টাকা নেওয়ার হিসাব রয়েছে। তবে এসব আয়োজন থেকে মাসে মোট কত টাকা আয় হতো, কারা সেই অর্থ পেতেন এবং বাড়ির মালিকের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন কীভাবে হতো, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
অভিযানে উদ্ধার করা সামগ্রীর তালিকায় এক লিটারের একটি পূর্ণ আইকোনিক হোয়াইট হুইস্কির বোতল, এক লিটারের রয়্যাল স্ট্যাগের বোতলে আনুমানিক ৫০০ মিলিলিটার এবং এক লিটারের স্মিরনফ ভদকার বোতলে প্রায় ২০০ মিলিলিটার মদের উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া ৭৫০ মিলিলিটারের কেরুজ ইম্পেরিয়াল হুইস্কির একটি খালি বোতল উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তালিকায় একটি ইয়াবা, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও অল্প পরিমাণ গাঁজাসদৃশ পদার্থের কথাও বলা হয়েছে। অভিযানে কনডম উদ্ধারের কথা জানিয়েছেন ইলিয়াস কবির। অন্যদিকে ডিবি মদ, সিনথেটিক মাদক, সিসা ও বিয়ার উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের সাজা সম্পর্কে ডিসি জানান, ৫৭ জন তরুণকে এক মাসের কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের আরও ১৫ দিন কারাভোগ করতে হবে। অন্যদিকে ২৬ জন তরুণীকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের আরও তিন দিন কারাগারে থাকতে হবে। আটক ব্যক্তিরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাঁদের অভিভাবকদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি।
তবে আটক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়ে বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে। পুলিশ প্রথমে ৮৫ জনকে আটকের কথা জানালেও পরে ৫৭ জন তরুণ ও ২৬ জন তরুণীর সাজা দেওয়ার তথ্য দেয়। এই দুই শ্রেণির মোট সংখ্যা ৮৩; বাকি দুজনের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযানে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, পার্টিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তানদের যাতায়াত ছিল। তাঁদের কয়েকজনকে তদবিরের মাধ্যমে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ছাড়া চট্টগ্রামে কর্মরত সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার একজন সদস্য সেখানে ছিলেন বলে জানা গেছে। তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সেনাবাহিনী নিজস্ব বিধি অনুযায়ী তাঁর বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।
অভিযানের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইলিয়াস কবির বলেন, আব্দুল্লাহ আল জহিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। এ ঘটনায় মামলা হয়নি বলেও জানান তিনি। পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী।
ফ্ল্যাটটির মূল হোস্ট হিসেবে নিজের নাম থাকা এবং পার্টির আয়ের ৭০ শতাংশ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল্লাহ আল জহির বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নিয়ম অনুযায়ী বাড়ির মালিক মূল হোস্ট হিসেবে থাকেন। তবে তিনি নিজে এসব আয়োজন পরিচালনা করেন না। ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মাহবুবুল আলমকে দেওয়া হয়েছিল।
জহিরের বক্তব্য, মাহবুবকে সব নিয়ম মেনে চলতে এবং কোনো অনিয়ম হলে তাঁকে জানাতে বলা হয়েছিল। প্রয়োজন হলে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশও ছিল। কিন্তু মাহবুব তাঁকে অনেক বিষয় জানাননি বলে দাবি করেন তিনি।
পার্টি থেকে পাওয়া আয়ের ৭০ শতাংশ নিজের পাওয়ার বিষয়ে জহির বলেন, ওই অর্থ মূলত তাঁর ভাড়ার টাকা। বাকি অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ মাহবুবুল আলম পান। এ ছাড়া হাউসকিপিংয়ের কর্মী ও মালি অর্থ পেয়ে থাকেন বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে, ফ্ল্যাটটির মালিক হিসেবে জহিরের নাম প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশ সদর দপ্তর তাঁকে ক্লোজ করার নির্দেশ দিয়েছে।
বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার এআইজি কামারুম মুনিরা বলেন, ডিবি ঘটনাটি তদন্ত করছে। তদন্তে জহিরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। সূত্র: আজকের পত্রিকা
সদ্য সংবাদ/এআর