নাম জামাল হলেও তার কামাল দেখে যে কারোরই চক্ষু চড়কগাছ হবে, তা হলফ করে বলাই যায়। জামাল হোসেন, পেশায় একজন পরিচ্ছন্নকর্মী। তবে সময়ে সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ফায়দা লুটে নিতে বেশ পটু তিনি। এক সময় স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন সেচ্ছাসেবক লীগের পদধারী নেতা হলেও বর্তমানে ভোল পাল্টে এবার সেচ্ছাসেবক দলে ঢুকে পড়েছেন কায়দা করে।
পেশায় ঝাড়ুদার হলেও তৎকালীন স্বৈরাচার সরকারের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের চিহ্নিত সন্ত্রাসী দারুসসালাম থানার সেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইসলামের আশীর্বাদে কপাল খুলেছিল জামালের। সংগঠনের সভাপতি ইসলামকে দেওয়া বার লাখ টাকার বিনিময়ে পাওয়া সহ-সভাপতি পদ ব্যবহার করে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হন জামাল।
গিরগিটি যে ভাবে রং বদলায়, ঠিক একই কায়দায় রজনৈতিক পালাবদলের সাথে জামাল হোসেন তার প্রয়োজন বা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দল বদল করেছেন। একসময় বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত জামাল ক্ষমতার পালাবদলের পর মিরপুর এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ইসলামের ছত্রছায়ায় আসেন, লাখ লাখ টাকা খরচ করে। তারপর আর তাকে পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। স্থানীয় নেতাদের চাপে ফেলা, গার্মেন্ট ব্যবসায়ী থেকে ফুটপাত কিংবা পরিচ্ছন্নকর্মীদের থেকে টাকা হতিয়ে নিয়েছেন নানান সময়ে নানান কৌশলে। চাঁদাবাজি, মাদক, পরিবহন খাতে নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মাধ্যমে আয় করা বিত্ত-বৈভব কোথাও গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন, আবার কোথাও করেছেন আলিশান ফ্ল্যাট। গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুর জেলায় হলেও তিনি তার চাকরি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহারের মাধ্যমে অমিন বাজরের বৈলাপুর বাজার স্টীল ব্রিজের পাশে নির্মাণ করেছেন চারতলা বহুতল ভবন। শুধু তাই নয়, দয়াগঞ্জে বাগিয়ে নিয়েছেন ২-৩টি ফ্ল্যাট। এছাড়া রাজধানীর গাবতলীতে পরিচ্ছন্ন কর্মীদের থাকার কলোনিতেও বাগিয়ে নিয়েছেন ১০-১২টি বসতঘর, যা বর্তমানে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন এই জামাল। জামাল, জাকির ও সালাম তিন ভাইয়ের তিনটি দোকান রয়েছে সেই গাবতলীর কলনীতে। যেখানে পরিচ্ছন্নকর্মীরা থাকার ঘর পাচ্ছেন না, সেখানে এমন জবর দখল করে বসতঘরকে দোকান বানিয়ে ব্যবসা করছেন জামালসহ তার অন্য দুই ভাই। মাসে ২০ হাজারেরও কম বেতনের একজন পরিচ্ছন্নকর্মীর গাবতলী এলাকায় ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগের ফার্মেসী রয়েছে।
অবৈধ সম্পদ গড়ার পাশাপাশি দখলের নজিরও কম নেই। ২৮নং ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নকর্মী মাহিতুন নেসার অবসরের ৪ লাখ টাকা ও ব্যবহৃত বসতঘর জোড়পূর্বক দখলে নিয়েছেন জামাল। দখলে নিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তার কোন ওয়ারিস নেই উল্লেখ করে জোড়পূর্বক স্ট্যাম্পে সই করিয়ে নেওয়ার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।
শুধু জামাল না, তার পুরো পরিবার এই পরিচ্ছন্নকর্মীদের চাকরি নিয়ে কাজ না করে বসে মাসের পর মাস সরকারি বেতন নিচ্ছেন। জামালের তিন ভাইয়ের মধ্যে জাকির হোসেন, যিনি বর্তমানে পঙ্গু অবস্থায় থেকেও সিটি কর্পোরেশনের বেতন নিয়মিত তুলছেন কোন ধরনের বাধা-বিপত্তি ছাড়াই। জামালের বোন কুলসুম চাঁদপুরের মতলবে থাকেন স্বামীর বাড়িতে, তবে খাতা-কলমে তিনি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নকর্মী। বেতনও পান নিয়মিত, কারণ তার ভাই বর্তমানে ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি আমিনুল ইসলামের কাছের লোক ও কথিত বিএনপি নেতা।
গাবতলী পরিচ্ছন্ন কলোনিতে থাকা পরিচ্ছন্নকর্মীদের সহশ্রাধিক বসতঘরে মিটার পাইয়ে দেবার নামে সেখান থেকেও বড় হরিলুট করেছেন এই ঝাড়ুদার জামাল। এক হাজার বসতঘর থেকে দুই হাজার টাকা চাঁদা তুলে তা নিজের পকেটে ঢুকিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া গত মাসের বিদ্যুৎ বিলের নামে এক হাজার বসতঘর ও দুই’শ দোকান থেকে আট’শ টাকা করে নয় লাখ ষাট হাজার টাকা তুলে নিজের পকেটে ভারি করেছেন বলেও নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন অনেকেই।
পতিত সরকারের আমলে তিনি দারুসসালাম থানা সেচ্ছাসেবকলীগের সহ-সভাপতি পদ বাগিয়ে নিলেও সরকার পতনের পর ঢাকা উত্তর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল ইসলামের সখ্যতায় বিএনপি নেতা হয়ে গেছেন। এই সখ্যতাকে পুঁজি করে সম্প্রতি তিনি পরিচ্ছন্ন কর্মীদের সংগঠন স্ক্যাভেঞ্জার্স এ্যান্ড ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন (রেজিস্ট্রেশন নাম্বার-৪৭৭৩) দখলে নিয়েছেন। কোন নির্বাচন না হলেও বড় নেতার সাথে তোলা ছবি ব্যবহার করে জবর দখলের মাধ্যমে সেখানে নিয়মিত অফিস করছেন তিনি ও তার প্যানেলের নেতারা। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ইউনিয়নে সরকার প্রধানের ছবি ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বর্তমান চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ছবি। আর এই ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমেই তিনি নিজেকে বিএনপির নেতা দাবি করে অনৈতিকভাবে কর্মীদের থেকে নির্ধারিত চাঁদার বাইরে অতিরিক্ত পরিমাণ চাঁদা আদায় করেন।
আরও চটকদার তথ্য হলো, তার পরিবারের মোট সকল সদস্যই সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন বিভাগের চাকরিতে নিয়োজিত। একই পরিবারের মা-বাবা ও তিন ভাই ও এক বোনসহ মোট ৬ জনের সবাই কিভাবে চাকরি পেলেন, সেটিও একটি অমিমাংসিত প্রশ্ন। অভিযোগ আছে, এর আগে এক গণমাধ্যমকর্মীকে সংবাদ প্রকাশের জেরে পেটানোর ঘটনায় তিনি সিটি করপোরেশন থেকে চাকরি হারান। নিয়ম অনুযায়ী ওই ঘটনার পর থেকে চাকরি হারানোর পাশাপাশি ইউনিয়নের সদস্যপদও হারান। তবে মহনগর উত্তরের আহ্বায়কের সখ্যতার কারণে তিনি এই জবরদখল ও চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাবতলী পরিচ্ছন্ন কর্মীদের কলোনিতেও রয়েছে তার একক আধিপত্য। সেখানেও তিনি প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিলের নামে ৮ লাখ টাকা চাঁদা তুলেন। পরিচ্ছন্নকর্মীদের বদলি দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে ও ২০ টাকা ইউনিয়ন চাঁদা ও মৃত্যু চাঁদা ১৮০ টাকাসহ মোট ২০০ টাকা চাঁদা তোলার নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অনেক ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নকর্মীদের থেকে নেওয়া হচ্ছে পাঁচশত টাকা। একসময় বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত জামাল ক্ষমতার পালাবদলের পর দারুসসালাম থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি মোঃ ইসলামের হাত ধরে ১৮ থেকে ২০টি মামলার আসামি হন।
সিটি কর্পোরেশনের সরকারি চাকরিজীবী মো জামাল দারুসসালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা হওয়ার ঘটনাটি তৎকালীন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর জামাল চাকরিচ্যুত হন। মো. ইসলাম দলীয় চাপের মুখে পরে তাকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হন। এখন আবার যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হল, ঠিক তখনই আবারো দলবদল করে সেই বিএনপির পালে বাতাস দিতে শুরু করেছেন জামাল হোসেন।
এই পরিচ্ছন্নকর্মীদের কাছে জামাল হোসেন এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। তাই সহসাই পরিচয় প্রকাশ করে তার বিরুদ্ধে কথা বলতে চান না কেউ। যদিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকেই কথা বলেছেন, জানিয়েছেন নানান অনিয়মের অভিযোগ। এই প্রতিবেদক রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে কর্মরত পরিচ্ছন্ন কর্মীদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানিয়েছেন, আগের মোট ২০০ টাকা চাঁদা আদায়ের পরিবর্তে কারো কাছ থেকে ৪০০ আবার কারো কাছ থেকে ৫০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ করেছেন। আবার অনেকে প্রাপ্য অধিকার চাইতে গিয়ে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন।
এত শত অভিযোগ নিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংবাদ প্রকাশ না করার কথা বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। তবে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে বারবার ফোন দিলেও পাওয়া যায়নি তাকে। যদিও সাংবাদিক পেটানোর কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন।
যেখানে রাষ্ট্র তার পরিচালন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে জামালদের মত রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারকারীরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের টাকা লুটে নিচ্ছেন অনৈতিকভাবে। এখন দেখার বিষয়, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেন।
আ. লীগ নেতা থেকে বিএনপি বনে যাওয়া কে এই জামাল?
পেশায় ঝাড়ুদার হলেও তৎকালীন স্বৈরাচার সরকারের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের চিহ্নিত সন্ত্রাসী দারুসসালাম থানার সেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইসলামের আশীর্বাদে কপাল খুলেছিল জামালের। সংগঠনের সভাপতি ইসলামকে দেওয়া বার লাখ টাকার বিনিময়ে পাওয়া সহ-সভাপতি পদ ব্যবহার করে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হন জামাল।
মন্তব্য (0)
মন্তব্য করুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
এই বিভাগের আরও খবর
থিয়ানিস এপারেলসের নামে কাপড়ের চালান, খুলতেই মিলল ১৬৫৫ মোবাইল
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
খাটের সঙ্গে শিকলে বেঁধে স্ত্রীকে নির্যাতন, তিন দিন পর মিলল মরদেহ
৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
গণপূর্তে 'তিন পাণ্ডবের' ক্ষমতার দাপট, উঠছে একের পর এক অভিযোগ
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ইউপি সচিব বারেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৪৯ ব্যাংক হিসাবে বিপুল লেনদেন, সাবেক এমপি হেনরী ও লাবুর সম্পদ নিয়ে নতুন তথ্য
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
-
হুতি হামলায় বড় ধাক্কা, ইউরোপে তেল সরবরাহ স্থগিত করল সৌদি আরামকো
-
ট্রান্সফরমার চুরির মামলায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাসহ গ্রেপ্তার ৫
-
মুন্সীগঞ্জে হেরোইনসহ ২ নারী মাদক ব্যবসায়ী আটক
-
স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলনে অসহায় নারীর কান্না
-
ঢাবির এক হলের পাশে ককটেল বিস্ফোরণ
-
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি নয়, দুটি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে: নয়াদিল্লি
-
গৃহকর্মী ধর্ষণ মামলার পলাতক আসামি ঢাকায় গ্রেপ্তার
-
পুলিশের আট কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়ন
-
ইউপি চেয়ারম্যান সুমনের রিটে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা স্থগিত আপিল বিভাগে
-
‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কেন ভারতে যাইনি?’, ব্যাখ্যা দিলেন আসিফ নজরুল