বাংলাদেশের নির্বাচন বদলে দিতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:২৮

১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন শুধু অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনাপরবর্তী বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব কিছুটা দুর্বল হওয়ায় সেই শূন্যস্থান পূরণে বেইজিং ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে চাইছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর এটিই বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ২০২৪ সালে তাঁর পতনের পর তাঁকে আশ্রয় দেওয়াকে কেন্দ্র করে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন টানাপোড়েনে পড়ে। বাংলাদেশ প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও ভারত আশ্রয় দেওয়ায় নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অসন্তোষ প্রকাশ করে। এরপর থেকেই ঢাকা–নয়াদিল্লি সম্পর্কের শীতলতা এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হয়ে ওঠে।

প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ শেখ হাসিনার শাসনামলে চীনের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রাখলেও কৌশলগতভাবে ভারতের সঙ্গেই ছিল সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সেই সমীকরণ এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ গবেষক জশুয়া কার্লান্টজিক বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং ভবিষ্যতের যেকোনো সরকার বাস্তব অর্থেই চীনের দিকে ঝুঁকছে। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে চীনের কৌশলগত চিন্তায় বাংলাদেশ এখন কেন্দ্রীয় অবস্থানে চলে এসেছে, এবং বেইজিং আত্মবিশ্বাসী যে এই কৌশলে ঢাকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে অধ্যাপক ইউনূসের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর ছিল চীন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়, যার আওতায় একটি ড্রোন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় নিশ্চিত।

এদিকে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নিয়মিত কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। গত ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং একে ‘চলমান আক্রমণ’ হিসেবে উল্লেখ করে। যদিও বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রায় ৭০ জন নিহত হয়েছেন। তবে ঢাকার দাবি, ভারত এই সহিংসতার মাত্রা অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরছে।

এর মধ্যেও সম্পর্ক মেরামতের কিছু উদ্যোগ দেখা গেছে। জানুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকে সমবেদনা জানিয়ে চিঠি পাঠান।

তবে পরে পরিস্থিতি আবার জটিল হয়ে ওঠে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বিক্ষোভের মুখে এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হলে বাংলাদেশ ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থি মনে করেন, শেষ পর্যন্ত দুই দেশই বাস্তববাদী অবস্থান নেবে। তাঁর মতে, সম্পর্কের অবনতি অব্যাহত থাকলে তার মূল্য কতটা বড় হতে পারে—তা ঢাকা ও নয়াদিল্লি উভয়ই বোঝে।

এদিকে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছে। এক দশকের বেশি সময় পর গত জানুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সরকার ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। দোন্থি বলেন, নতুন সরকার অস্থিরতার চেয়ে স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দেবে।

অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক হুমায়ুন কবিরের মতে, নির্বাচিত সরকারের অধীনে—বিশেষ করে বিএনপি ক্ষমতায় এলে—ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক আবার স্থিতিশীল হতে পারে। তিনি বলেন, একসময় ভারতের সঙ্গে তীব্র বিরোধে থাকা জামায়াতে ইসলামীও এবারের নির্বাচনে বাস্তববাদী অবস্থান তুলে ধরছে।

সব বিতর্কের মধ্যেও ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের বাস্তব ভিত্তি এখনো অটুট বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্থিতিশীল রয়েছে এবং শেখ হাসিনা সরকারের সময় সই হওয়া মাত্র একটি চুক্তি, ভারতীয় টাগবোটসংক্রান্ত চুক্তি, বাতিল করা হয়েছে।

ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও ঢাকায় দেশটির উপহাইকমিশনার দিলীপ সিনহা বলেন, চীন এমন অবকাঠামো নির্মাণ করে যা ভারত পারে না। তবে বিদ্যুৎ ও পোশাকশিল্পের কাঁচামালের মতো যেসব বিষয়ে বাংলাদেশ নির্ভরশীল, সেগুলো ভারত সরবরাহ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও তা ভারতের সঙ্গে শত্রুতায় রূপ নেওয়া অপরিহার্য নয়। হুমায়ুন কবির বলেন, এটি ‘একটি না হলে আরেকটি’ পরিস্থিতি নয়; চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সমান্তরালভাবেই বিকশিত হতে পারে। 

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. স্কুল কমিটি নিয়ে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে যুবক নিহত, আহত ২৮ সদ্য. তেজগাঁও কলেজ মসজিদে ‘গোপন বৈঠক’, জঙ্গি সন্দেহে আটক ২৩ সদ্য. রাজধানীর চার এলাকায় ৮ ককটেল বিস্ফোরণ সদ্য. কুড়িগ্রামের ফের সার নিয়ে উত্তেজনা, অবরুদ্ধ কৃষি কর্মকর্তা সদ্য. শেখ হাসিনা আমলের ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করবে বাংলাদশে, প্রতিক্রিয়ায় যা বলল ভারত সদ্য. ক্ষমা না চাইলেও একাত্তরের অবস্থান মেনে নিয়েছে জামায়াত: আইনমন্ত্রী সদ্য. দেশে হাম উপসর্গে মৃত্যু ৯৫০ ছুঁই ছুঁই সদ্য. অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে দুর্নীতি ও নোট বাণিজ্য বরদাশত হবে না: কাজল সদ্য. তারেক রহমানের হাতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সুরক্ষিত নয়: নাহিদ সদ্য. নভেম্বরে দিল্লি সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: দ্য হিন্দু সদ্য. স্কুল কমিটি নিয়ে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে যুবক নিহত, আহত ২৮ সদ্য. তেজগাঁও কলেজ মসজিদে ‘গোপন বৈঠক’, জঙ্গি সন্দেহে আটক ২৩ সদ্য. রাজধানীর চার এলাকায় ৮ ককটেল বিস্ফোরণ সদ্য. কুড়িগ্রামের ফের সার নিয়ে উত্তেজনা, অবরুদ্ধ কৃষি কর্মকর্তা সদ্য. শেখ হাসিনা আমলের ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করবে বাংলাদশে, প্রতিক্রিয়ায় যা বলল ভারত সদ্য. ক্ষমা না চাইলেও একাত্তরের অবস্থান মেনে নিয়েছে জামায়াত: আইনমন্ত্রী সদ্য. দেশে হাম উপসর্গে মৃত্যু ৯৫০ ছুঁই ছুঁই সদ্য. অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে দুর্নীতি ও নোট বাণিজ্য বরদাশত হবে না: কাজল সদ্য. তারেক রহমানের হাতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সুরক্ষিত নয়: নাহিদ সদ্য. নভেম্বরে দিল্লি সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: দ্য হিন্দু