মার্কিন বিচার বিভাগ জেফরি এপস্টাইন সংক্রান্ত ৩০ লক্ষাধিক পৃষ্ঠার গোপন নথি বা ‘এপস্টাইন ফাইলস’ প্রকাশ করার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। গত শুক্রবার অবমুক্ত করা এসব নথিতে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং দুই হাজার ভিডিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেখানে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও তারকাদের ব্যক্তিজীবনের নানা অন্ধকার দিকের তথ্য উঠে এসেছে।
সদ্য প্রকাশিত নথিতে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির মা এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত চলচ্চিত্র পরিচালক মীরা নায়ারের নামও পাওয়া গেছে। নথিতে সংরক্ষিত ২০০৯ সালের ২১ অক্টোবরের একটি ইমেলে উল্লেখ রয়েছে, মীরা নায়ারের নির্মিত ‘অ্যামেলিয়া’ চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার-পরবর্তী অনুষ্ঠান দণ্ডিত যৌন পাচারকারী ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েলের বাসভবনে আয়োজন করা হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও আমাজনের প্রধান নির্বাহী জেফ বেজোস উপস্থিত ছিলেন বলে ইমেলে উল্লেখ করা হয়। প্রচারক পেগি সিগালের পাঠানো ওই ইমেলে ছবিটি নিয়ে সমালোচনা করে একে ‘মৃদু’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।
নথি থেকে আরও জানা যায়, ২০১২ সালে টেসলা প্রধান ইলন মাস্ক ও জেফরি এপস্টাইনের মধ্যে একাধিক ইমেল আদান-প্রদান হয়েছিল। একটি ইমেলে এপস্টাইন মাস্ককে তার ব্যক্তিগত দ্বীপে সফরের বিষয়ে জানতে চান এবং কতজন সেখানে যাবেন তা প্রশ্ন করেন। জবাবে মাস্ক লেখেন, সম্ভবত তিনি ও তাঁর তৎকালীন স্ত্রী তালুলাহ সেখানে যেতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, কোন দিন দ্বীপে সবচেয়ে ‘বন্য পার্টি’ হয়ে থাকে।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে ২০১৯ সালের একটি এফবিআই সাক্ষাৎকারের নথি থেকে। সেখানে এক যুবক অভিযোগ করেন, ২০০০ সালে একটি ইয়টে তাকে বিল ক্লিনটন ও জেফরি এপস্টাইন যৌন নির্যাতন করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, ওই সময় বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগকারী আরও বলেন, তাকে মাদক সেবন করিয়ে অচেতন রাখা হয়েছিল এবং সেখানে শিশুদের অঙ্গচ্ছেদসহ ভয়াবহ কিছু ধর্মীয় আচার পালন হতে দেখেছেন।
তবে এফবিআইয়ের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যুবকটিকে মাইকেল মুর নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে এফবিআইয়ের কাছে আনা হয়েছিল এবং সে সময় তাকে ‘মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন’ বলে বর্ণনা করা হয়।
এপস্টাইন ফাইলসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম একাধিকবার উঠে এসেছে। নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রায় ২৫ বছর আগে নিউ জার্সিতে ১৩ থেকে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ট্রাম্পের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের মার-এ-লাগো এস্টেটে আয়োজিত বিভিন্ন পার্টিতে ইলন মাস্ক, ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও ইভানকা ট্রাম্পের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ রয়েছে।
নথি প্রকাশ নিয়ে বিচার বিভাগের ব্যাখ্যায় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্ল্যাঞ্চ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এসব তথ্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে মার্কিন জনগণের কাছে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটেছে। তিনি দাবি করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প বা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিকে রক্ষার চেষ্টা করা হয়নি এবং আইন অনুসরণ করেই সব নথি জনসমক্ষে আনা হয়েছে।
এদিকে হোয়াইট হাউস কিংবা মার্কিন বিচার বিভাগ এখনো নতুন অভিযোগগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। নথিতে থাকা অধিকাংশ তথ্য এফবিআইয়ের কাছে আসা ফোনকল বা প্রাথমিক সাক্ষাৎকারের সারসংক্ষেপ, যেগুলো এখনো আইনগতভাবে প্রমাণিত নয়। এরই মধ্যে নাম উঠে আসা একাধিক ব্যক্তি তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।