জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর যে সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েছে, তাতে কোনো বাধা দেখছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে সাংবিধানিক সংস্থাটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, রিটার্নিং কর্মকর্তারা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—কোনো পক্ষের হয়েই প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দ হবে ২১ জানুয়ারি। ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে নির্বাচনি প্রচার, যা শেষ হবে ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরুর আগেই গণভোট নিয়ে প্রচার শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
রোববার ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, প্রধান উপদেষ্টা নিজেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচার চালানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং এতে আইনগত কোনো বাধা নেই। সরকারের এ অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনাও এসেছে। কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছেন, এতে সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
তবে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ মনে করেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত অসঙ্গত নয়। তিনি বলেন, দেশের ও ভবিষ্যতের স্বার্থে সরকার সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে এবং জুলাই সনদ তৈরি করেছে। সেই সরকার যদি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়, সেটিকে তিনি অযৌক্তিক মনে করেন না।
একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তারা কোনোভাবেই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারে যুক্ত হতে পারবেন না। তাদের নিরপেক্ষ থাকা বাধ্যতামূলক। সরকার ও রিটার্নিং কর্মকর্তার ভূমিকা এক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে গণভোটের বিষয়গুলো নিয়ে নির্বাচন কমিশন নিজেও প্রচার ও জনসচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। ভোটাররা দুটি ব্যালট পেপারে ভোট দেবেন—একটিতে সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী ও প্রতীক, অন্যটিতে চারটি বিষয়ের ওপর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট।
সংসদ ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় নির্বাচনি অপরাধ, দণ্ড ও বিচার পদ্ধতি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী পরিচালিত হবে। যদিও সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীরা নির্ধারিত সময়ের আগে প্রচার চালালে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ প্রচার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গণভোট অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনে যেসব কাজ অপরাধ বা আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়, একই ধরনের কাজ গণভোটের ক্ষেত্রেও যতদূর প্রযোজ্য, লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। এরই মধ্যে শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীকে গণভোট নিয়ে প্রচার চালানোর কারণে শোকজ নোটিস দেওয়া হয়েছে।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আচরণবিধি মূলত সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের জন্য। গণভোটে কোনো প্রার্থী বা দল নেই। তবু তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ২১ জানুয়ারির আগে প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের প্রচার না করা। আগাম প্রচার সমীচীন নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এবার সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং ৪৯৯ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মাছউদ বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তারা গণভোটের বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রচার করতে পারবেন, তবে কোনো পক্ষ নিতে পারবেন না। ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’—কোনো দিকেই অবস্থান নেওয়া তাদের জন্য সঠিক নয়।
এদিকে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নেতারা এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টামণ্ডলী ও মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য জনমতকে প্রভাবিত করছে এবং সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করছে। তাদের মতে, অতীতে অনুষ্ঠিত গণভোটগুলোতে সরকার কেবল অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিল, ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—কোনো পক্ষের প্রচার চালায়নি। এবার সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোট না দিলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে—এমন প্রচার ভবিষ্যতে গণভোটকে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। সূত্র: বিডিনিউজ২৪