ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় রাখা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর রেসকোর্স ময়দানের ভাষণের ছবি ও ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ছবি ভাঙচুরের ঘটনায় নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
সোমবার দুপুরে ডাকসুর সংগ্রহশালায় ঢুকে ছবির ফ্রেম ভাঙচুর ও ছবি ছিঁড়ে ফেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আব্দুল্লাহ আল মামুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের টিপু-সুজন কমিটির সহসম্পাদক ছিলেন। তিনি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী সিএফসি গ্রুপের নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার ও সরবরাহকারী।
জিন্নাহর ছবি ভাঙচুরের পর ঘটনাটির ছবি ও তথ্য ফেসবুকে প্রকাশ করেন আল মামুন। সেখানে নিজেকে তিনি ঘটনার ‘সরাসরি যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্য একটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আজ চিহ্নিত রাজাকার ডাকসু প্রজন্ম মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ছবি টাঙ্গিয়ে ছিলো—মুক্তিযোদ্ধা ও ভাষা আন্দোলনে শহীদ হওয়া সবার উপরে ডাকসুর ভিতরে! কিন্তু সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে তা ভেঙ্গে ফেলা হয়। ইতিহাস কি মুছা যায় এত সহজে!’
ডাকসুর সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর একটি ছবি প্রতিস্থাপনের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন’ পর্বে ছবিটি যুক্ত করা হয়েছিল। এটি ১৯৪৮ সালে প্রথমবার ঢাকায় এসে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর দেওয়া ভাষণের ছবি। ওই ভাষণে তিনি পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর নাম ঘোষণা করেছিলেন।
সোমবার দুপুরে সংগ্রহশালায় গিয়ে আবু তৈয়ব ছবিটি সরিয়ে এর ফ্রেম ভাঙচুর করেন। একই সময়ে ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক উত্থাপিত পাকিস্তান আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল লাহোর প্রস্তাবের ছবিও ভাঙচুর করা হয়। ওই ছবিতে জিন্নাহর পাশে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
গত ডাকসু নির্বাচনে আলোচিত ও বয়োজ্যেষ্ঠ সহসভাপতি প্রার্থী ছিলেন আবু তৈয়ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের উর্দু বিভাগের এই শিক্ষার্থী নির্বাচনে পেয়েছিলেন ১০ ভোট।
ছবি ভাঙচুরের আগে গণমাধ্যমকে আবু তৈয়ব বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূত্র জিন্নাহ তৈরি করে দিয়েছিলেন। কার্জন হলে শিক্ষার্থীদের সামনে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে, বাংলা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী বলেছিলেন, জিন্নাহর এই সিদ্ধান্ত তাঁরা মানেন না।
আবু তৈয়ব আরও বলেন, ভাষা আন্দোলনের মূল নায়ক হিসেবে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম ১১ মার্চ ১৯৪৮ আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বে হরতাল পালিত হয়েছিল। ওই ঘটনায় অনেক শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হন, যাঁদের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। তাঁর ভাষ্য, সেই জিন্নাহ ডাকসুর সংগ্রহশালায় স্থান পেতে পারেন না।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আকস্মিকভাবে শুরু হয়নি; এর আগে একাধিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। তাঁর দাবি, জিন্নাহ ধারাবাহিকভাবে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং এই অঞ্চলের পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
এস এম ফরহাদ বলেন, ওই বক্তব্যকে ভাষা আন্দোলনের পটভূমি হিসেবে সংগ্রহশালায় উল্লেখ করা হয়েছে। ছবির নিচে ইংরেজিতে দেওয়া ক্যাপশনে জিন্নাহর বক্তব্য সরাসরি উদ্ধৃত করা হয়েছিল। এরপর ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী প্রেক্ষাপট কীভাবে তৈরি হয়, সেটিও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে। সূত্র: বাংলাদেশ বুলেটিন
সদ্য সংবাদ/ এআর