নাটোর শহরের কান্দিভিটা মহল্লার আলোচিত বিলাসবহুল ‘জান্নাতি প্যালেস’ এখন যেন ধ্বংসস্তূপ। একসময় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনায় মুখর থাকা তিনতলা বাড়িটি আগুন, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর পরিণত হয়েছে পোড়া বাড়িতে। রাত নামলেই পুরো ভবনজুড়ে নেমে আসে নীরবতা, তৈরি হয় ভূতুড়ে পরিবেশ।
বাড়িটির মালিক নাটোর-২ (সদর-নলডাঙ্গা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল। তিনি ওই আসন থেকে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত শিমুলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই বাড়ি।
০৪ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্তও বাড়িটি ছিল কর্মচঞ্চল। পরে শত শত বিক্ষুব্ধ মানুষ সেখানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। আগুনে বাড়ির বিভিন্ন অংশ, আসবাবপত্র ও মূল্যবান সামগ্রী পুড়ে যায়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় বাড়িতে থাকা তিনটি বিলাসবহুল গাড়িও।
হামলার সময় বাড়িতে থাকা বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র, ফ্রিজ, এসি, ওভেনসহ নানা ইলেকট্রনিক সামগ্রী লুট করা হয়। বাড়িতে বিতরণের জন্য রাখা ছিল বিপুল পরিমাণ ক্রীড়াসামগ্রী ও হাজার হাজার কম্বল। এসব সামগ্রীরও অনেক কিছু নিয়ে যায় হামলাকারীরা।
এমনকি বাড়ির প্রবেশপথে থাকা বড় আকারের স্টিলের গেটটিও খুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত বাড়িটিকে ঘিরে তাণ্ডব চলে বলে স্থানীয়রা জানান।
ঘটনার সময় বাড়িতে শফিকুল ইসলাম শিমুলের পরিবারের কোনো সদস্য ছিলেন না। কর্মচারীরাও এর আগেই বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শফিকুল ইসলাম শিমুলের রাজনৈতিক প্রভাবের সময় ‘জান্নাতি প্যালেস’ শুধু একটি আবাসিক ভবন ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল স্থানীয় রাজনীতি ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র।
প্রতিবেশী ও স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, নাটোরে ঠিকাদারি কাজ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও বদলি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রীড়াঙ্গন এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নানা কর্মকাণ্ডে এই বাড়ি থেকে নির্দেশনা দেওয়া হতো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, শিমুল নাটোরে অবস্থান করলে এই বাড়িতেই থাকতেন। তখন গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকত। বাড়ির সামনে ও ভেতরে সবসময়ই লোকজনের উপস্থিতি দেখা যেত।
এখন সেই বাড়ির চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। পোড়া দেয়াল, ভাঙা জানালা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ আর আগুনে পুড়ে যাওয়া সামগ্রী ভবনটির আগের জৌলুশের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে।
শফিকুল ইসলাম শিমুলের পরিবারের সম্পদ নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কানাডার টরন্টোর বেগমপাড়া এলাকায় তার স্ত্রী শামীমা সুলতানা জান্নাতির নামে একটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে, যার নামও ‘জান্নাতি প্যালেস’।
স্থানীয়দের দাবি, শিমুলের স্ত্রী-সন্তানরা দীর্ঘ সময় কানাডায় অবস্থান করেছেন। এ বাড়ি ও বিদেশে সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।
দুদকের জনসংযোগ দপ্তর জানিয়েছে, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে কমিশন থেকে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে টিআর ও কাবিখার বরাদ্দে অনিয়ম এবং লুটপাটের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের পাশাপাশি নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ অর্জন করেছেন শিমুল। এসব অর্থের একটি অংশ দিয়ে দেশে ও বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে শিমুলের স্ত্রী শামীমা সুলতানা জান্নাতির সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। আয়কর নথির বরাত দিয়ে বলা হয়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জান্নাতির সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে সম্পদ কিছুটা বাড়লেও ২০২০-২১ অর্থবছরে তা একলাফে আরও কয়েক কোটি টাকা বেড়ে যায়।
অভিযোগকারীদের দাবি, একজন গৃহবধূ হিসেবে তার নামে দেশ-বিদেশে বিপুল সম্পদের মালিকানা এবং অস্বাভাবিক হারে সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
শিমুলের বিরুদ্ধে কানাডায় অর্থপাচারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কানাডার বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক হিসাব ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে। তার নিজের নামে একাধিক হিসাবের পাশাপাশি কানাডার এক নাগরিকের নামেও ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
একসময় যে বাড়ির সামনে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিড় লেগে থাকত, এখন সেখানে পড়ে আছে পোড়া গাড়ির ধ্বংসাবশেষ। আগুনে কালো হয়ে গেছে দেয়াল। ভেঙে পড়েছে বিভিন্ন অংশ। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পুড়ে যাওয়া আসবাব ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী।
স্থানীয় এক দর্শনার্থী বলেন, এই সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় আগে প্রায়ই বাড়ির ভেতরে-বাইরে মানুষের ভিড় দেখা যেত। সাধারণ মানুষও বাড়ির ভেতরে যাতায়াত করত। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই পরিচিত বাড়ির এমন পরিণতি দেখে তিনি বিস্মিত।
দিনের আলোয় কৌতূহলী মানুষের ভিড় থাকলেও রাত নামলে বাড়িটি পরিণত হয় নীরব, অন্ধকার এক ধ্বংসস্তূপে।
রাজনৈতিক প্রভাব, বিলাসবহুল জীবনযাপন, দেশ-বিদেশে সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগ সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা নাটোরের ‘জান্নাতি প্যালেস’ এখন নিজেই হয়ে উঠেছে একটি আলোচিত ধ্বংসাবশেষ।
সদ্য সংবাদ/এসএস