জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় সংঘটিত ছয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই রায়ে দলটির আরও তিন নেতাকে আমৃত্যু কারাগারে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের নেতৃত্বে ছিলেন চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া তিন আসামি হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। মামলার চার আসামিই পলাতক থাকায় তাঁদের পক্ষে আদালতে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী দায়িত্ব পালন করেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, চার নেতার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে জুলাইয়ের আন্দোলন দমনে উসকানি ও সহায়তা, কুষ্টিয়ায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বক্তব্য ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হানিফ সহিংসতা উসকে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগের বিষয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে বৈঠক ও নির্দেশনার অভিযোগও আনা হয়।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে হানিফসহ দলটির স্থানীয় নেতারা অংশ নেন। ওই বৈঠকে আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে হানিফের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিবরণ প্রসিকিউশনের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত।
মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ছয়জনের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে চলা কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নামেন। সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের জমায়েত ও মিছিল চলার মধ্যে তাঁদের ওপর গুলির ঘটনা ঘটে। দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে শহরের একাধিক স্থানে ছয়জন নিহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এসব হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে চার আসামির সংশ্লিষ্টতা ছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা এবং হত্যার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়।
২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। পরদিন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেন। একই বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।
মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরাসহ মোট ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় ২৩ এপ্রিল। এরপর ১০ জুন যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হলেও রাষ্ট্রপক্ষ অতিরিক্ত প্রমাণ দাখিল করায় পুনরায় যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। গত ৭ অক্টোবর উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়।
সদ্য সংবাদ/এসএস