নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি- এমন অভিযোগের মধ্যেই পুরান ঢাকায় নির্মিত ঢাকা জেলা পরিষদের ২০ তলা ভবন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণ করা হয় ভবনটি। তবে নির্মাণপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসার পর ২০১৭ সাল থেকে এর কার্যক্রম আটকে ছিল।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউকের ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র, নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা, ড্যাপ, ফ্লোর এরিয়া রেশিও, সেটব্যাক, মাটির পরীক্ষা, কাঠামোগত নকশা এবং বড় স্থাপনার ক্ষেত্রে পরিবেশ ও অগ্নিনিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা জেলা পরিষদের এই ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়নি। পুরান ঢাকার জজকোর্টসংলগ্ন সড়কের বিপরীতে এক বিঘার বেশি জমির ওপর নির্মিত ভবনটিতে নির্মাণকাজের মান, ঠিকাদারি প্রক্রিয়া, দোকান বরাদ্দ এবং আর্থিক লেনদেন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
২০১৭ সালের পর ভবন-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও পাওয়া যাচ্ছিল না বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে এসব অনিয়মের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। পুরোনো অনিয়মের নিষ্পত্তি ছাড়াই ভবনটি চালুর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন করে শুরু হয়েছে কার্যক্রম
বর্তমান জেলা পরিষদ প্রশাসন ভবনটি চালুর লক্ষ্যে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে আগের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি যৌথ জরিপ ও কারিগরি যাচাইয়ের জন্য পৃথক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
জেলা পরিষদ জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ভবনটির কারিগরি যাচাই ও সনদ দেওয়ার কাজ করছে। একই সঙ্গে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতিও চলছে।
এদিকে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর রাজউক থেকে ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। সাধারণ নিয়মে ভবনের নকশা অনুমোদনের আগেই এ ধরনের ছাড়পত্র নেওয়ার কথা থাকায়, নির্মাণ শেষ হওয়ার পর সেই অনুমোদন পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের আপত্তি
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান আইন ভঙ্গ করলে তাদের কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। বরং অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তার প্রশ্ন, বিশাল একটি বহুতল ভবন অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ করা হলে সংশ্লিষ্ট সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি কোথায় ছিল। সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিল করা হলে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা কমে যেতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান অবস্থায় রয়েছে। সরকারি ভবন হওয়ায় নির্মাণের সময় বিষয়টি হয়তো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। এ ছাড়া কিছু সরকারি ভবনের নকশা প্রধান স্থপতির কার্যালয় থেকে প্রস্তুত করা হয় বলেও জানিয়েছেন তারা।
ভবন চালুর যুক্তি
ঢাকা জেলা পরিষদের কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ পড়ে থাকা ভবনটি আর নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাটি ব্যবহারযোগ্য করে তোলার পাশাপাশি জেলা পরিষদের নিজস্ব কার্যালয় সেখানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
জেলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ভবনটিতে দুটি বেজমেন্ট, ২০টি ফ্লোর, প্রতিটি তলায় প্রায় ১৫ হাজার বর্গফুট বাণিজ্যিক জায়গা এবং একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম রয়েছে। নির্মাণ সম্পন্ন হলে জেলা পরিষদের কার্যক্রমও সেখানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমানে জেলা পরিষদের কার্যক্রম উত্তরা সেক্টর-৬-এর একটি অস্থায়ী কার্যালয় থেকে পরিচালিত হচ্ছে।
গত ১৫ জুলাই জেলা পরিষদের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের সম্পন্ন করা কাজের যৌথ পরিমাপ ও জরিপ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভবনের কারিগরি যাচাই ও সার্টিফিকেশনের কাজও শুরু হয়েছে।
তবে ওই বিজ্ঞপ্তিতে নির্মাণকালীন অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ নথি নিখোঁজ হওয়া কিংবা এসব ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ঢাকা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বদরুদ্দোজা শুভ বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ভবনটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের সময়ের যেসব ব্যত্যয় ছিল, সেগুলো সংশোধন করে বিধি মেনেই পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নতুন করে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ রাখা হবে না বলেও জানান তিনি।
সদ্য সংবাদ/এসকে