দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে কমিশনের দুই সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান এবং ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া।
সোমবার, ১৭ আগস্ট এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর বিধান অনুযায়ী নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের বেতন, ভাতা, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও পদমর্যাদা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারকের সমান নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে দুই কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার বেতন-ভাতা, সুবিধা ও মর্যাদা হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকের সমপর্যায়ের করা হয়েছে।
এর আগে সোমবার বিকেলে নতুন কমিশন গঠনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্চ কমিটি তিনজনের নাম চূড়ান্ত করে সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দেয়। পরে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেই নিয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়।
বিচারপতি আসাদুজ্জামানের কর্মজীবন
বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি আপিল বিভাগ থেকে অবসরে যান। এর আগে ২৫ মার্চ ২০২৫ সালে সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে তাঁকে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আপিল বিভাগে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
১৯৫৯ সালের ১ মার্চ জন্ম নেওয়া বিচারপতি আসাদুজ্জামান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৩ সালে জেলা আদালতের আইনজীবী হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। ১৯৮৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগ এবং ২০০১ সালে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন তিনি।
২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান আসাদুজ্জামান। দুই বছর পর, ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। দীর্ঘ সময় হাইকোর্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনের পর আপিল বিভাগে যোগ দেন।
দুই কমিশনারের পরিচয়
নতুন কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তিনি ১৯৮৫ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন বলে জানা গেছে। কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে সচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
অন্য কমিশনার ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক কর কমিশনার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
কেন নতুন কমিশন
গত ৩ মার্চ দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ তিন কমিশনার পদত্যাগ করলে কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য হয়ে পড়ে। এরপর নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সদস্যসচিব করে সার্চ কমিটি গঠন করে সরকার।
সার্চ কমিটি পরপর ছয়টি বৈঠকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই করে। দীর্ঘ পর্যালোচনার পর চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং কমিশনার হিসেবে ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার নাম চূড়ান্ত করা হয়।
দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারের পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় কমিশনের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন এমন অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও আটকে ছিল। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব কার্যক্রমে গতি ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকের নতুন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা সংকটের কারণে সব কমিশন পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। সর্বশেষ কমিশনও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করে।
এ অবস্থায় নতুন কমিশনের সামনে দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা, দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা অনুসন্ধান ও তদন্তে গতি আনা এবং প্রতিষ্ঠানটির ওপর জনআস্থা বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সদ্য সংবাদ/এসকে